
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: অমর একুশে বইমেলার তসলিমা নাসরিনের বই রাখাকে কেন্দ্র করে একটি স্টলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসময় ওই বইয়ের প্রকাশককে করা হয়েছে লাঞ্ছিত। উত্তেজনার মুখে স্টল বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি গ্রেফতার করা হয়েছে ওই প্রকাশককে। নজরবন্দি বাংলাদেশের অভিনেত্রী ও প্রকাশক সনজানা মেহেরান।
সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের ১২৮ নম্বর সব্যসাচী স্টলে এ হামলা হয়, হামলাকারীদের মাথায় টুপি এবং পরনে ছিল পাজামা-পাঞ্জাবী। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নিষিদ্ধ নয় এমন বই প্রদর্শনে কোনও ধরনের বাধা নেই বই বিক্রেতাদের। তাসত্ত্বেও সোমবার তসলিমা নাসরিনের বই রাখাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে ওঠে বইমেলা। হামলায় বেশিরভাগ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ছিল বলে জানিয়েছেন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁরা জানান, পঞ্জাবী-টুপি পরা দাড়িওয়ালা কিছু লোকজন সব্যসাচী স্টলে গিয়ে জানতে চায় তারা কেন তসলিমা নাসরিনের ‘চুম্বন’ বই প্রকাশ করেছে। এসময় বইয়ের প্রকাশক শতাব্দী ভব তাদের জানান, তসলিমার বই প্রকাশে আইনগত কোনো বিধিনিষেধ নেই, প্রকাশ করলে সমস্যা কোথায়? দুই পক্ষের তর্ক-বিতর্ক শুরু হলে ওই লোকজন শতাব্দী ভবকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মারতে উদ্যত হয়। শতাব্দী ভবও ‘জয়া বাংলা’ স্লোগান দিয়ে তাদের জবাব দেন।
জয় বাংলা স্লোগান দিতেই শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে, বলেই দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের। জয় বাংলা স্লোগান শুনে এ সময় দর্শনার্থীরাও ‘আওয়ামী লীগের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’; ‘স্বৈরাচারের দালালেররা, হুঁশিয়ার সাবধান’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। এরই মাঝে ভারতের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবল চেষ্টাও করে হামলাকারীরা। তাঁদের দাবি, ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। বিষয়গুলো নাকি পরিকল্পিত। ছাত্র-জনতাকে উস্কে দেয়ার জন্যই এমন প্ল্যান করেছে হাসিনা। যাতে করে বইমেলায় একটা বড় ধরণের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। বইমেলাটি পন্ড হয়ে যায়, এই পরিকল্পনা ভারতের বলেও দায় চাপিয়ে দেয় একদল দুষ্কৃতী। সোশ্যাল মিডিয়াতেও উঠে আসে নানা তথ্য।
এক পর্যায়ে জড়ো হওয়া লোকজন শতাব্দী ভবকে মারধর শুরু করলে পুলিশ এসে তাঁকে রক্ষা করেন বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। পাশাপাশি ‘সব্যসাচী’ নামের ওই স্টলটি বন্ধ করে দেয় পুলিস। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম সাংবাদিকদের জানান, শতাব্দী ভবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে মামলা দায়ের করা হবে।
এর আগে সোমবার দুপুরে প্রকাশক শতাব্দী ভব তার নিজস্ব ফেসবুক আইডি থেকে হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। তাঁকে বলতে শোনা যায়, “গতরাত থেকে একাধিক ইসলামিস্ট গ্রুপ ও বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের স্টল ভাঙচুরের জন্য উসকানি দিচ্ছিল। একারণে শাহবাগ থানার ওসি, বইমেলার নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং বাংলা একাডেমি কর্তপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু সবাই নিরাপত্তার স্বার্থে তসলিমা নাসরিনের বইগুলো সরিয়ে নিতে বলে। বাংলা একাডেমি ও প্রশাসন যদি না চায় তাহলে তো বই প্রদর্শন করতে পারবো না। অথচ আমাদের নিরাপত্তার দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। বাধ্য হয়ে বইমেলা থেকে তসলিমা নাসরিনের বইগুলো সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছি”। সব্যসাচীর আরেক প্রকাশ ও অভিনেত্রী সনজানা মেহেরানও হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
এ বছরই তসলিমা নাসরিনের ‘চুম্বন’বইটি প্রকাশিত হয়েছে। তার পর থেকেই একের পর এক হুমকি আসছে প্রকাশকের কাছে। সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একের পর এক বার্তায় সব্যসাচীর দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছেন তসলিমাও। মঙ্গলবার তিনি লেখেন, ‘সব্যসাচী স্টল বন্ধ বইমেলায়। এই লজ্জা কার? প্রকাশক শতাব্দি ভব বইমেলায় আসতে পারছে না, কারণ জিহাদি জঙ্গিরা তাকে মেরে ফেলতে চাইছে। এই লজ্জা কার? শতাব্দি ভব তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে তার বাড়িতে বাস করতে পারছে না। এই লজ্জা কার? মনে আছে নিলয়ের কথা? জিহাদিদের থ্রেট পাওয়ার পর নিলয় পুলিশ প্রটেকশান চেয়েছিল। পুলিশ তাকে প্রটেকশান দেয়নি। পরদিন কয়েকটা জিহাদি তার বাড়িতে ঢুকে তাকে কুপিয়ে মেরে এসেছে। শতাব্দি ভবও থ্রেট পাওয়ার পর বাংলা একাডেমি আর থানার পুলিশকে জানিয়েছে। বাংলা একাডেমির কেউ স্টলে আসেনি, যখন শতাব্দি ভবকে ঘিরে ধরেছিল উন্মত্ত জঙ্গি জিহাদির দল। পুলিশ এসে গ্রেফতার করেছে লেখক প্রকাশক সঙ্গীতশিল্পী শতাব্দী ভবকে। পুলিশের সামনেই যারা ভবকে খুন করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই জিহাদিদের কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। যারা ভাংচুর করছিল বইয়ের স্টল–সেই জঙ্গিদের কাউকে একটুখানি ধমকও দেয়নি পুলিশ, গ্রেফতার তো দূরের কথা। শতাব্দি ধনী কোনও প্রকাশক নয়। অতি ক্ষুদ্র এক প্রকাশক। দারিদ্রের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। বহু পরিশ্রম করে সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে ছোট এক প্রকাশনী শুরু করেছিল। এখন কী করবে সে? বইমেলায় সে কি আর যেতে পারবে? স্টলে বসতে পারবে? বই বিক্রি করতে পারবে? না পারবে না। স্ত্রী সন্তান নিয়ে সে না খেয়ে মরবে। জিহাদিরা তো তাকে কোথাও দেখলেই খুন করবে। খুন করবে সে তসলিমার বই প্রকাশ করেছিল বলে, তসলিমার বই বিক্রি করেছিল বলে। লাল বিপ্লবের পর জিহাদিরা খুনের লাইসেন্স পেয়ে গেছে। অবাধে লুটতরাজ খুন খারাবি চালিয়ে যাচ্ছে। মব ভায়োলেন্স এখন তাদের নিত্য দিনের উল্লাস। তাদের বাধা দেওয়ার কেউ নেই। এই লজ্জা কার? এই লজ্জা মোহাম্মদ ইউনুসের। এই লজ্জা উপদেষ্টামন্ডলীর। এই লজ্জা বাংলা একাডেমির পরিচালকবৃন্দের। এই লজ্জা পুলিশ বাহিনীর। এই লজ্জা মুখ বুজে থাকা সমস্ত প্রকাশক আর সমস্ত লেখকদের। ধিক ধিক ধিক’।
(Feed Source: zeenews.com)
