Opinion: পশ্চিমবঙ্গ দিবস: যেদিন বাংলা তার আত্মাকে বেছে নিয়েছিল: ড: সুকান্ত মজুমদার

Opinion: পশ্চিমবঙ্গ দিবস: যেদিন বাংলা তার আত্মাকে বেছে নিয়েছিল: ড: সুকান্ত মজুমদার

এই দিনটি, যা আজ ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ নামে পরিচিত, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের স্মারক, যখন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ঝড়ের মুখে একা একটি জ্বলন্ত প্রদীপের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন বাঙালির পাশে। বাংলাকে মুসলিম লিগের বিস্তারবাদী ষড়যন্ত্রের গ্রাস থেকে রক্ষা করেছিলেন। যখন দেশভাগের নকশা আঁকছিলেন কিছু ঔদাসীন্যে ভরা ক্ষমতাবান, তখন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মানচিত্রের নকশার পক্ষে নয়, বিবেকের পক্ষে সওয়াল করেন। গলার জোড়ে নয়, তেজ এবং নির্ভীকতায় গড়ে তোলেন প্রতিবাদ।

সে সময় বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন হোসেন সোহরাওয়ার্দি, ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র খলনায়ক। তিনিই ‘যুক্ত বাংলা’ নামে এক পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলেন, বলছিলেন, হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে থেকে স্বাধীন বাংলা বানাবে, ভারত-পাকিস্তান কোনও দেশেরই অঙ্গ হবে না বাংলা। শুনতে ভাল লাগলেও এ ছিল এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র। মহম্মদ আলি জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বের এক নয়া মোড়ক। লক্ষ্য ছিল একটাই, কলকাতা সহ পূর্ব বাংলা নিয়ে একটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আলাদা দেশ বানানো। এই ষড়যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠেছিলেন এক জনই, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘‘এই যুক্ত বাংলা আসলে ভার্চুয়াল পাকিস্তান।’’ তিনি বলেছিলেন, এমনটা হলে বাঙালির সত্ত্বা হারিয়ে যাবে, থাকবে না বাংলার মন্দির, গান, ভাষা, ঐতিহ্য। তিনি ছিলেন আপসহীন। না ব্রিটিশ রাজকে, না কংগ্রেস নেতাদের, না ধর্মীয় ফাঁদকে, কোনও কিছুকেই পরোয়া করেননি। এটা নিছক রাজনৈতিক অবস্থান ছিল না, ছিল এক সভ্যতাকে আগলে রাখার মরিয়া প্রয়াস। তাঁর প্রচেষ্টা ‘যুক্ত বাংলা’ ষড়যন্ত্রকে ভেস্তে দিতে এবং পশ্চিমবঙ্গকে ভারতীয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। এর মাধ্যমেই রক্ষা পেয়েছিল বাংলার সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত পরিচয়। কেউ তখন হয়তো ভাবেনইনি, এই একটা মানুষের লড়াই পুরো ইতিহাসই ঘুরিয়ে দেবে।

তবুও আজ, যখন পশ্চিমবঙ্গ তার অস্তিত্বের আরও একটি বর্ষপূর্তি পালন করছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যের সরকার এই দিনের কথা স্মরণ করতে অস্বীকার করছে। তারা চাইছে ২০ জুনের মতো একটি ঐতিহাসিক দিনকে জনচেতনা ও ক্যালেন্ডার থেকে চুপিসারে মুছে ফেলতে, বিনাযুদ্ধে রচনা করতে এক বিকৃত ইতিহাস, যেখানে আত্মত্যাগ, বলিদানের কোনও স্থান নেই। ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’-এর বদলে আমাদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে ‘পয়লা বৈশাখ’, একটি সংস্কৃতিমুখর উৎসবকে নিয়ে করা হচ্ছে রাজনীতি।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু একবার সতর্ক করে বলেছিলেন, “সবচেয়ে বড় অপরাধ হল অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা, ভুলকে নিয়ম বলে মেনে নেওয়া।” আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার, তোষণের তাড়নায়, সেই উত্তরাধিকারকেই অস্বীকার করছে। যে উত্তরাধিকার বাংলা‌কে একদিন সাংস্কৃতিক নিশ্চিহ্নতার হাত থেকে রক্ষা করেছিল। ২০শে জুনকে অস্বীকার মানে শুধু এক ঐতিহাসিক তারিখকে অগ্রাহ্য করা নয়, এটা স্মৃতির পবিত্রতাকে অপমান, দেশভাগের ক্ষতিকে উপেক্ষা, আর ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সতর্কবার্তাকে অগ্রাহ্য করা। এ কি নিছকই অজ্ঞতা, না কি ইচ্ছাকৃত বিস্মরণ?

মনে রাখা দরকার, ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র বর্বর গণহত্যার পর যখন অধিকাংশ নেতা নিরুত্তর ছিলেন, তখন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছিলেন, জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে কঠিন বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন, সোহরাওয়ার্দির ‘যুক্ত বাংলা’ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন এবং বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি আবেদন রেখেছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না, ছিল বাংলা ও বাঙালির সভ্যতা ও স্বপ্নকে বাঁচানোর আহ্বান।

তিনি সেদিন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, রক্ষা করেছিলেন পরিচয়। তিনি বাঁচিয়েছিলেন সেই বাংলা, যে বাংলা শুধু ভূগোলের বিষয় নয়, এক সভ্যতার নিদর্শন। যেখানে চৈতন্যে দেবের কীর্তন আছে, বিদ্যাসাগরের সমাজচিন্তা আছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য আছে, আর সুভাষ বোসের বীরত্ব আছে। সেই বাংলা, যেখানে নদী শুধু জল নয়, বইয়ে আনে স্মৃতি, আত্মসম্মান আর প্রতিরোধের ধারা।

এই ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ কোনও দলীয় বা রাজনৈতিক দিন নয়, এ হল প্রতিটি বাঙালির নৈতিক উত্তরাধিকার। এই দিনটি সেই মাটির স্পন্দন, যে মাটি একদিন ভারতবর্ষকে দিয়েছে তার শ্রেষ্ঠ চিন্তক, শিল্পী, সমাজসংস্কারক ও শহিদদের।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।” ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শুধু প্রার্থনা করেননি, তিনি লড়াই করেছিলেন। আজকের দিনে বাংলা যদি তার প্রকৃত রূপ, চেতনা ফিরে পেতে চায়, তবে ২০শে জুনের দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। এটি কোনও স্মৃতিমেদুরতা নয়, এটি এক তীব্র প্রয়োজন। আমরা যখন ২০ জুনকে স্মরণ করি, তখন দেশভাগের উৎসবে মত্ত হই না, বরং শ্রদ্ধা জানাই সেই দৃঢ়তাকে, যা বিভাজনের মধ্যেও আত্মমর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখার লড়াই লড়েছিল। আজ যখন বাংলা হিংসা, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সংস্কৃতির অবক্ষয়ে দিশেহারা, তখন ২০শে জুন শুধু অতীত নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য এক দিশা। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাংলার ভূমিপুত্র, ২০শে ডিসেম্বর সেই ভূমিপুত্রের তাঁর মাতৃভূমির জন্যে অধিকার ছিনিয়ে আনার দিন।

এই অনিশ্চয়তার ঘনঘোরে আমাদের আবার ফিরতে হবে বিবেকের দিকনির্দেশে। আত্মবলিদান ও দূরদর্শিতার আলোয় দীপ্ত এই ২০শে জুন আমাদের অন্তরের কম্পাস হয়ে আমাদের সেই সঠিক পথ দেখাবে।

চলুন, আবার জেগে উঠি। ঠিক যেভাবে এর আগেও একদিন বাংলা জেগে উঠেছিল, ভারতকে বেছে নিয়েছিল, সভ্যতাকে বেছে নিয়েছিল, ঐতিহ্যকে বেছে নিয়েছিল। আজ ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’-এ, বাংলার আবার আওয়াজ তোলার সময় এসেছে। এবার সেই কণ্ঠস্বর শুধু বাংলায় নয়, ছড়িয়ে পড়ুক গোটা বিশ্বে।

লেখক- সুকান্ত মজুমদার, কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এবং রাজ্য বিজেপি সভাপতি

(Feed Source: news18.com)