
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: কাজে একটু দেরি করে এসেছিলেন চার মহিলা সাফাইকর্মী। এর কারণ জানতে চেয়েছিলেন সুপারভাইজার। দেরির কারণ হিসেবে ওই চার কর্মী জানিয়েছিলেন, তাঁদের ‘পিরিয়ডস’ চলছে। তাঁদের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি সুপারভাইজার। ওই সাফাইকর্মীদের কাপড় খুলে ‘পিরিয়ডস’-এর প্রমাণ দেখাতে বলেন তাঁরা বলে অভিযোগ। হরিয়ানার রোহতকের মহর্ষি দয়ানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় শুরু হয়েছে বিতর্ক। তার জেরে দুই সুপারভাইজারকে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এবার এই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন(SCBA) দ্রুত পদক্ষেপের আর্জি জানিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করেছে, যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মহিলা এবং মেয়েদের উপর ক্রমবর্ধমান মর্যাদাহানিকর তল্লাশি ও পরীক্ষা-র ঘটনাগুলির বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত:
‘ঋতুস্রাব’ চলছে কি না ‘প্রমাণ’ করার জন্য পুরুষ সহকর্মীদের সামনেই পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয় ওই চার মহিলা কর্মীকে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমেছে পুলিস। অভ্যন্তরীণ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও।
জানা গিয়েছে, গত ২৬ অক্টোবর হরিয়ানার রোহতকের মহর্ষি দয়ানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনাটি ঘটেছে। ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসার কথা ছিল হরিয়ানার রাজ্যপাল অসীমকুমার ঘোষের। সেই মতো তোড়জোড়ও চলছিল। কিন্তু ওই দিন কাজে আসতে দেরি হয়ে যায় চার মহিলা সাফাইকর্মীর। তাঁরা জানান, ঋতুস্রাব চলাকালীন অসুস্থতার কারণে তাঁদের কর্মস্থলে পৌঁছোতে দেরি হয়ে গিয়েছে। অভিযোগ, সে সব যুক্তি মানতে চাননি ঊর্ধ্বতনেরা। উল্টে সত্যিই ঋতুস্রাব চলছে কি না প্রমাণ করার জন্য এক জনকে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। তাঁর অন্তর্বাস পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয় আর এক মহিলাকে। দাবি, ‘প্রমাণ’ হিসেবে অন্তর্বাসের ছবিও তুলে রাখেন পুরুষ সহকর্মীরা।
এর পরেই ওই দুই কর্মী বিনোদ কুমার এবং বীতেন্দ্র কুমারের বিরুদ্ধে হেনস্থার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ শুরু করেন মহিলা কর্মীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাও বিক্ষোভে যোগ দেন। রেজিস্ট্রার কৃষ্ণকান্ত গুপ্ত এবং উপাচার্য রাজবীর সিংহ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই মহিলাদের সঙ্গে কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত দুই অভিযুক্তকে কাজ থেকে বরখাস্ত করা হয়। খবর দেওয়া হয় পুলিসেও। সূত্রের খবর, ওই দুই সুপারভাইজারকে রোহতকে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অনুমতি ছাড়া ওই দু’জন শহরের বাইরে যেতে পারবেন না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে পুলিস এসে ওই দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ধরে নিয়ে যায়।
অন্য দিকে, খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করেছে হরিয়ানা মহিলা কমিশন। কমিশনের চেয়ারপার্সন রেণু ভাটিয়া ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, ‘এক জন মহিলাকে তাঁর ঋতুস্রাব চলছে কি না প্রমাণ দেখাতে বলার চেয়ে জঘন্য আর কিছু হতে পারে না।’ ইতিমধ্যে রোহতকের পুলিস সুপারকে চিঠি লিখে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানতে চেয়েছে কমিশন। যোগাযোগ করা হয়েছে আক্রান্ত মহিলাদের সঙ্গেও।
এসসিবিএ (SCBA) এই ঘটনাকে মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং শারীরিক স্বায়ত্তশাসনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। এসসিবিএ দ্বারা উল্লিখিত পূর্বের ঘটনাগুলি পিটিশনে অতীতে ঘটা আরও কয়েকটি আক্রমণাত্মক পরীক্ষার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে:
উত্তর প্রদেশ (২০১৭): ৭০ জন মেয়েকে কথিত মেনস্ট্রুয়াল রক্ত পরীক্ষা করার জন্য পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়েছিল।
গুজরাট (২০২০): শিক্ষার্থীদের অন্তর্বাস খুলে পরিদর্শনের জন্য বাধ্য করা হয়েছিল।
মহারাষ্ট্র (জুলাই ২০২৫): অধ্যক্ষ রক্তমাখা স্যানিটারি প্যাডের ছবি দেখানোর পর মেয়েদের শারীরিক পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হয়েছিল।
এসসিবিএ জানিয়েছে যে, ভারতীয় সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদ-এর ভিত্তিতে এই ঘটনা জীবন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারকে উলঙ্ঘন করেছে।
SCBA সুপ্রিম কোর্টের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আর্জি জানিয়েছে এবং নিম্নোক্ত নির্দেশগুলি চেয়েছে:
1.রোহতকের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হোক।
2.কেন্দ্র সরকার এবং হরিয়ানা রাজ্যকে এই ঘটনা তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হোক।
3.কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে মহিলাদের স্বাস্থ্য, মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং শারীরিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার রক্ষার জন্য দেশব্যাপী নির্দেশিকা জারি করা হোক।
4.এসসিবিএ জোর দিয়েছে যে বিশেষ করে অসংগঠিত কাজের ক্ষেত্রে মহিলা কর্মীদের শালীন ও সম্মানজনক কাজের পরিবেশ প্রাপ্য।
পিটিশনে আহ্বান জানানো হয়েছে, জৈবিক পার্থক্যকে সম্মান জানাতে এবং ঋতুস্রাবের ব্যথা বা অস্বস্তিতে ভুগছেন এমন কর্মীদের জন্য যুক্তিসঙ্গত ছাড় দেওয়ার জন্য নিয়ম তৈরি করা হোক।
(Feed Source: zeenews.com)
