
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাসর রাতের রেশ কাটতেই বিচ্ছেদ! পুণেতে প্রেমের (Pune marriage ended in 24 hours of marriage) বিয়ের ‘অকালপ্রয়াণ’ মাত্র ২৪ ঘণ্টায়।
বিয়ের সানাইয়ের সুর তখনও কানে লেগে আছে। মণ্ডপের ফুলগুলোও হয়তো পুরোপুরি শুকিয়ে যায়নি। কিন্তু এরই মধ্যে বাসর রাতের আনন্দ ছাপিয়ে নেমে এল বিচ্ছেদের বিষণ্ণ সুর। প্রেমের সম্পর্কের পর মহা ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু সেই দাম্পত্যের (Conjugal Life ended in 24hrs) আয়ু স্থায়ী হলো মাত্র ২৪ ঘণ্টা। মহারাষ্ট্রের পুণেতে এক চিকিৎসক (Maharashtra Doctor) ও ইঞ্জিনিয়ার (Maharashtra Engineer) দম্পতির এই নজিরবিহীন বিবাহবিচ্ছেদ (Divorce Case) এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে (Pune couple divorced in day after marriage)।
দুই বছরের প্রেম, এক দিনের সংসার
ভারতের মতো দেশে যেখানে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা বছরের পর বছর আদালতের নথিতে ধুলো জমায়, সেখানে এই ঘটনাটি কার্যত অবিশ্বাস্য। আইনজীবী সূত্রে জানা গিয়েছে, এই দম্পতি গত দুই-তিন বছর ধরে একে অপরের গভীর প্রেমে মগ্ন ছিলেন। পেশাগত দিক থেকেও দু’জনই সমাজের চোখে অত্যন্ত সফল। স্ত্রী একজন চিকিৎসক এবং স্বামী একজন ইঞ্জিনিয়ার। দীর্ঘ পরিচয়ের পর দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁরা চার হাত এক করেন। কিন্তু বিয়ের মণ্ডপ থেকে ঘরমুখী হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয় বাস্তবতার সংঘাত।
কেন এই আকস্মিক ভাঙন?
এই চাঞ্চল্যকর মামলাটি পরিচালনা করেছেন আইনজীবী রানি সোনাওয়ানে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঝগড়া বা অশান্তি নয়, বরং ভবিষ্যৎ জীবনযাপন এবং থাকার জায়গা নিয়েই বিবাদের সূত্রপাত। বিয়ের ঠিক পর মুহূর্তেই স্বামী তাঁর স্ত্রীকে জানান যে, তিনি পেশাগত কারণে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে (Merchant Navy/Ship) কর্মরত। তাঁর কাজের ধরণ এমনই যে, বছরের দীর্ঘ সময় তাঁকে সমুদ্রেই কাটাতে হবে। শুধু তাই নয়, তাঁর পোস্টিং কোথায় হবে বা কতদিনের জন্য তাঁকে বাইরে থাকতে হবে, সে বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য তাঁর কাছে নেই।
স্বামীর এই অনিশ্চিত জীবনযাত্রা মেনে নিতে পারেননি চিকিৎসক স্ত্রী। তাঁর মতে, দাম্পত্যের শুরুতে যদি থাকার ঠিকানাই অনিশ্চিত হয়, তবে সেই সম্পর্ক বয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত দুই-তিন বছরের প্রেমের সম্পর্কে এই মৌলিক বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনও বিস্তারিত আলোচনাই হয়নি।
আদর্শগত ফারাক ও সুপ্রিম কোর্টের পথ
আইনজীবী রানি সোনাওয়ানে বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতাদর্শগত ফারাক এতটাই গভীর ছিল যে তাঁরা কোনও দেরি না করেই আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।’ সাধারণত বিবাহবিচ্ছেদের জন্য ভারতে দীর্ঘ অপেক্ষার নিয়ম থাকলেও, সুপ্রিম কোর্টের কিছু বিশেষ নির্দেশিকা রয়েছে যেখানে বিবাদের ধরন অত্যন্ত প্রকট হলে এবং আপসের সম্ভাবনা না থাকলে দ্রুত বিচ্ছেদ সম্ভব। এই দম্পতি সেই আইনি পথই বেছে নেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিচ্ছেদে কোনও তিক্ততা বা কাদা ছোড়াছুড়ি ছিল না। আইনি পরিভাষায় যাকে বলে ‘মিউচুয়াল কনসেন্ট’ বা পারস্পরিক সম্মতি। দম্পতির বিরুদ্ধে একে অপরের প্রতি কোনও হিংসা, যৌতুক বা ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ নেই। দু’জনই অত্যন্ত শিক্ষিত এবং পরিণত মানুষের মতো আইনি পথে হেঁটে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বৈবাহিক সম্পর্কের ইতি টানেন। বিয়ের পরের দিন থেকেই তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন।
অবাক আইনজীবীও
দীর্ঘদিন ধরে আইনি পেশায় যুক্ত থাকা রানি সোনাওয়ানে নিজেও এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘দুই বছর বা তার বেশি সময় ধরে সম্পর্কে থাকার পরও এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— যেমন ভবিষ্যৎ থাকার জায়গা ও কাজের ধরন— আলোচিত হয়নি, তা সত্যিই আশ্চর্যের।’ তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের জানাশোনা থাকা সত্ত্বেও এমন মৌলিক বিষয়ে মতভেদ থাকা সত্যিই বিরল।
সম্পর্কের গভীরতা বনাম বাস্তবতার সংঘাত
পুণে-র এই ঘটনা সমাজতাত্ত্বিকদেরও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, শুধুমাত্র দীর্ঘ সময়ের আলাপ বা রোমান্টিক প্রেমই সফল দাম্পত্যের গ্যারান্টি নয়। বাস্তব জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত, পেশাগত সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত পছন্দের অমিল অনেক সময় সম্পর্কের ভিত নড়িয়ে দেয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রেমের সময় মানুষ আবেগে ভেসে অনেক সময় ভবিষ্যতের রূঢ় বাস্তব নিয়ে কথা বলতে ভুলে যায়। কিন্তু বিয়ের পর যখন বাসর ঘরের রোমান্টিকতা শেষ হয়ে সংসারের দায়বদ্ধতা শুরু হয়, তখনই আসল চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। পুণের এই দম্পতি হয়তো নিজেদের প্রতি সৎ ছিলেন বলেই সম্পর্কের তিক্ততা বাড়িয়ে বছরের পর বছর টানার চেয়ে শুরুতেই ‘ফুলস্টপ’ দেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছেন।
ভারতে যেখানে বিয়েকে একটি পবিত্র এবং অটুট বন্ধন হিসেবে দেখা হয়, সেখানে মাত্র ২৪ ঘণ্টার এই বিবাহবিচ্ছেদ সমাজের চিরাচরিত ধারণায় বড় একটি ধাক্কা। তবে আধুনিক প্রজন্মের কাছে হয়তো এটি ‘ব্যর্থ’ সম্পর্কের চেয়ে ‘স্বচ্ছ’ সিদ্ধান্তের উদাহরণ। পুণের এই বিরল কিন্তু স্পষ্ট ঘটনাটি মনে করিয়ে দিচ্ছে— বিয়ের আগে শুধু মন দেওয়া-নেওয়া নয়, ভবিষ্যতের থাকার ঠিকানা আর কাজের ধরণ নিয়েও আলোচনাটা সেরে রাখা জরুরি। নচেৎ, বিয়ের মণ্ডপের স্মৃতি হাতড়ানোর আগেই আদালতের বারান্দায় দাঁড়াতে হতে পারে।
(Feed Source: zeenews.com)
