জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মায়ের আয় বেশি হলেও সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না বাবা: দিল্লি হাইকোর্ট
সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণ বা ভরণপোষণের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ দিল্লি হাইকোর্টের (Delhi High Court)। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, মা যদি বাবার চেয়ে বেশি অর্থ উপার্জনও করেন, তবুও সন্তানদের ভরণপোষণের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব থেকে একজন বাবা তাঁর দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতে পারেন না। কেবল মা বেশি উপার্জন করেন বলেই একজন বাবা তাঁর নাবালক সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে পারেন না। আদালত জানিয়েছে যে, এক অভিভাবকের আয় অন্য অভিভাবককে তাঁর আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেয় না।
মামলার প্রেক্ষাপট
জনৈক এক ব্যক্তি পারিবারিক আদালতের (Family Court) একটি নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। পারিবারিক আদালত তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিল তাঁর দুই সন্তানকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ভরণপোষণ বাবদ দিতে হবে। ওই ব্যক্তির দাবি ছিল, তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী (সন্তানদের মা) একজন উচ্চপদস্থ পেশাদার এবং তাঁর আয় ওই ব্যক্তির চেয়ে অনেক বেশি। তাই সন্তানদের দেখভালের সম্পূর্ণ খরচ মায়েরই বহন করা উচিত। গত শনিবার বিচারপতি স্বর্ণকান্ত শর্মার বেঞ্চ এই রায় দিয়েছেন।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে বিয়ের পর কয়েক বছর যেতে না যেতেই দম্পতি আলাদা হয়ে যান। স্ত্রীর অভিযোগ ছিল, স্বামী তাঁর ওপর শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতন চালিয়েছেন। এরপর ওই নারী ‘গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইন’-এর অধীনে মামলা করেন এবং সন্তানদের জন্য ভরণপোষণ দাবি করেন।
নিম্ন আদালতের নির্দেশ: ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নিম্ন আদালত নির্দেশ দেয় যে, ওই ব্যক্তিকে তাঁর তিন সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৩০,০০০ টাকা রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ দিতে হবে।
স্বামীর যুক্তি: ওই ব্যক্তি হাইকোর্টে দাবি করেন যে, তাঁর মাসিক আয় মাত্র ৯,০০০ টাকা, যেখানে তাঁর স্ত্রীর আয় ৩৪,৫০০ টাকা। তাঁর যুক্তি ছিল, স্ত্রীর আয় বেশি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ওপর এই আর্থিক বোঝা চাপানো আইনসম্মত নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্ত্রী নারীবাদী অধিকারের অপব্যবহার করছেন।
স্ত্রীর যুক্তি: স্ত্রী জানান, সন্তানদের প্রতিদিনের খরচ, পড়াশোনা এবং চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তিনি একাই পালন করছেন। তাঁর নিজস্ব আয় থাকলেও বাবা হিসেবে স্বামীর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি স্বর্ণকান্ত শর্মার সিঙ্গল বেঞ্চ এই মামলার শুনানিতে স্বামীর যুক্তি খারিজ করে দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণগুলি–
যৌথ দায়িত্ব: আদালত জানায়, সন্তানদের বড় করে তোলা এবং তাদের আর্থিক চাহিদা পূরণ করা বাবা ও মা—উভয়েরই যৌথ দায়িত্ব।
আয়ের তুলনা অপ্রাসঙ্গিক: মা বাবার চেয়ে বেশি উপার্জন করছেন, এই অজুহাতে বাবা তাঁর দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন না। আর্থিক সচ্ছলতা নির্বিশেষে একজন বাবার কর্তব্য তাঁর সন্তানদের জন্য অবদান রাখা।
সন্তানের জীবনযাত্রা: আদালত জোর দিয়ে বলে যে, সন্তানদের জীবনযাত্রার মান যাতে বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করা বাবার কর্তব্য। মা কত আয় করছেন তা এক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়।
রায়ের তাৎপর্য
দিল্লি হাইকোর্টের এই রায়টি রক্ষণাবেক্ষণ (Maintenance Case) সংক্রান্ত মামলাগুলোতে একটি নজির হয়ে থাকবে। অনেক সময় বিচ্ছেদ বা বিবাহবিবাদের ক্ষেত্রে স্বামীরা স্ত্রীর আয়ের দোহাই দিয়ে সন্তানদের খরচ দিতে অস্বীকার করেন। হাইকোর্ট পরিষ্কার করে দিল যে, ‘হিন্দু অ্যাডপশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, সন্তানদের ভরণপোষণের প্রাথমিক দায়বদ্ধতা থেকে বাবাকে নিষ্কৃতি দেওয়া যাবে না।
আদালত আরও জানায় যে, স্ত্রী যদি বাধ্য হয়ে এই দ্বৈত দায়িত্ব পালন করেন, তবে তার অর্থ এই নয় যে বাবার দায় কমে যাবে। আদালতের কথায়, ‘আইন কখনওই কোনো কর্মজীবী মাকে শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিকভাবে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলতে বাধ্য করে না; আবার একজন বাবাকে তাঁর আয়ের তথ্য গোপন করে বা প্রযুক্তিগত অজুহাতে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও দেয় না।’
আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে, স্ত্রীর এই আচরণ নির্ভরশীলতা বা অযৌক্তিক অধিকারবোধ নয়, বরং সন্তানদের প্রতি অন্য সঙ্গীকে তাঁর দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। বিচারপতির ভাষায়, ‘স্ত্রীর এই আচরণ কোনো সুবিধাভোগী মানসিকতা নয়, বরং স্বামী-স্ত্রীর মিলনের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানদের প্রতি দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ।’
হাইকোর্ট পারিবারিক আদালতের নির্দেশটি বহাল রাখে এবং ওই ব্যক্তিকে বকেয়া অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়।
(Feed Source: zeenews.com)
