
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: এক-দু’বার নয়, দেশের মধ্যে পরপর আটবার স্বচ্ছ শহরের তালিকায় প্রথম স্থান দখল করে আছে মধ্য প্রদেশের ইন্দোর। আর সেই শহরেই জলে তীব্র দুর্গন্ধ। দূষিত সেই জল খেয়ে এক শিশু-সহ ৯জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৫০ জনের বেশি লোক হাসপাতালে ভর্তি। জানা গিয়েছে, তাঁরা গত ছয় মাস ধরে এই দূষিত জল পান করে আসছিলেন। দূষিত জলের শিকার পাঁচ মাসের শিশুটি মারা গিয়েছে, তার বাড়িতে হাহাকার পরিস্থিতি।
‘ঈশ্বর আমাদের দশ বছর পর সুখ দিয়েছিলেন এবং তারপর ঈশ্বর তা ফিরিয়ে নিয়েছেন,’ এই কথাগুলো বারবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে, ইন্দোরের ভাগীরথপুরে এক বৃদ্ধা চুপচাপ কাঁদছেন। তাঁর সামনের ঘরে একটি ছোট বিছানা। ঘরটিতে কোনো আওয়াজ নেই- শুধু নীরবতা। ওই ঘরের এককোণায় বসেছিলেন হতভাগ্য মা। ১০ বছর পর কোলে সন্তান এলেও, তাঁর বুকে দুধ আসেনি! তাই সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেনি সেই মা। ভরসা করতে হয়েছিল বাইরের প্যাকেটজাত দুধে। আর সেই কঠিন বাস্তবেই আবার কোল খালি হয়ে গিয়েছে তাঁর।
চিকিৎসকের পরামর্শে, শিশুটিকে প্যাকেটজাত দুধের সঙ্গে জল মিশিয়ে খাওয়ানো হত। সেই জল, যা তারা বিশ্বাস করেছিল। সেই জল, যা পরে বিষে পরিণত হয়। পাঁচ মাসের ছোট্ট অভ্যান আর নেই। ভাগীরথপুরে দূষিত জল খেয়ে অনেক মানুষ মারা গেছেন। অভ্যানের বাবা সুনীল সাহু একটি কুরিয়ার কোম্পানিতে কাজ করেন। অনেক বছর পর, ৮ জুলাই তাদের ছেলে জন্ম নেয়—দশ বছর পর তাদের মেয়ে কিঞ্জলের পর।
অভ্যান পুরোপুরি সুস্থ ছিল। কিন্তু দুই দিন আগে, অভ্যান জ্বর এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু তার অবস্থা খারাপ হতে থাকে। রবিবার রাতে সে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ে। সোমবার সকালে, হাসপাতাল যাওয়ার পথে অভ্যান মারা যায়। পরিবার মনে করে, অভ্যান অসুস্থ হয়েছিল জল খাওয়ার কারণে। সুনীল বলেন, ‘কেউ আমাদের বলেনি যে জল দূষিত ছিল। আমরা সেটি ছেঁকে নিতাম, অ্যালাম মেশাতাম, তারপরও ব্যবহার করতাম। পুরো পাড়া একই জল ব্যবহার করছিল। কোনো সতর্কীকরণ বা পরামর্শও দেওয়া হয়নি। আমি বিশ্বাস করি, সেই জলই তাকে মেরেছে।’
সুনীল আরও বলেন, ‘আমার স্ত্রী অভ্যানকে দুধ খাওয়াতে পারত না, তাই আমরা চিকিৎসকের পরামর্শে প্যাকেটজাত দুধে জল মিশিয়েছিলাম। আমরা নর্মদা ট্যাপ জল ব্যবহার করেছিলাম। কখনও ভাবিনি, ওই জল এতটাই দূষিত ছিল। সে দুই দিন ডায়রিয়ায় ভুগেছিল। আমরা ওষুধ দিয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ সে পড়ে গেল। পরে শুনলাম যে, এখানে সবাই জানত জলটি কতটা খারাপ ছিল।’
এই ঘটনার শিকড়ে আবার সেই পুরনো অভিযোগ। বাসিন্দারা প্রায় ছয় মাস আগে জানিয়েছিলেন যে, তাদের পানীয় জলে সমস্যা রয়েছে। তারা পৌরসভার কাছে অভিযোগ করেছিলেন, এমনকী মুখ্যমন্ত্রী হেল্পলাইনে বিষয়টি জানিয়েও ছিল। কিন্তু, তাদের অভিযোগে কেউ কান দেয়নি।
মেয়র পুষ্যমিত্র ভর্গব জানিয়েছেন যে, জলের পাইপলাইন পরিবর্তনের জন্য টেন্ডার জারি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই টেন্ডার আজও অনুমোদিত হয়নি। কেন? কারণ, পৌরসভা কর্মকর্তারা দুর্নীতি করার চেষ্টা করছিলেন। টেন্ডার দেওয়া হয়নি, এবং এর ফলস্বরূপ এত বড় বিপদ দেখা দিল! মেয়র নিজেই বললেন, ‘যদি পাইপলাইন বদলানো হত, তাহলে আজ এই মৃত্যু হত না।’
এদিকে, ঘটনা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে, মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টও নীরব থাকতে পারেনি। তারা রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এবং এই ঘটনায় দ্রুত একটি রিপোর্ট জমা দিতে হবে। হাই কোর্টের নির্দেশ ছিল, ‘অত্যন্ত দ্রুতই এই ঘটনার বিষয়ে রিপোর্ট দিন।’ বুধবার, মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে যে, ইন্দোর শহরে দূষিত জল খেয়ে বমি ও ডায়রিয়া আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা বিনামূল্যে দিতে হবে।
হাই কোর্টের ইন্দোর বেঞ্চ সরকারকে দুটি দিনের মধ্যে (২ জানুয়ারির মধ্যে) দূষিত জল সংক্রান্ত ঘটনায় একটি স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। মধ্যপ্রদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর ইন্দোরে এত বড় বিপদ! বিপদ শুধু এখানেই থেমে নেই। হাসপাতালগুলোতে ১৪৯ জন রোগী ভর্তি, এবং তাদের অবস্থা নিয়ে চিকিৎসকরা উদ্বিগ্ন।
(Feed Source: zeenews.com)
