জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বহু প্রজন্ম ধরে আমাদের শেখানো হয়েছে যে, শেষ বয়সের জন্য টাকা জমানো শেষ বয়সের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় কাজ। কিন্তু ইলন মাস্কের (Elon Musk) মতে, এই ধারণা এখন অবাস্তব। বিশ্বের এই শীর্ষ ধনী ব্যক্তি সম্প্রতি suggest করেছেন যে, পেনশনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমানোর (Money savings for future) পুরো ধারণাটিই খুব শীঘ্রই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে। কোনও সংস্কার বা পরিবর্তন নয়, বরং এই ধারণা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এবং অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে আসা এই দাবিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চমক। এই সময়ে সাধারণ মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। মাস্কের এই যুক্তির মূলে রয়েছে একটি বৈপ্লবিক বিশ্বাস—প্রযুক্তি খুব শীঘ্রই বৈশ্বিক অর্থনীতির মানচিত্র পুরোপুরি বদলে দিতে যাচ্ছে।
‘মুনশটস উইথ পিটার ডায়াম্যান্ডিস’ পডকাস্টে মাস্ক তার চিরচেনা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই এই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমার একটি পরামর্শ হলো: আগামী ১০ বা ২০ বছর পরের অবসরের কথা ভেবে টাকা জমিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। কারণ তখন এগুলোর কোনো মূল্য থাকবে না।’ তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা যা বলছি তার কোনোটি যদি সত্যি হয়, তবে অবসরের জন্য সঞ্চয় করা হবে অর্থহীন।’ তিনি বিষয়টিকে নিছক কোনো কল্পনা বা আশা হিসেবে নয়, বরং একটি যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। এবং তিনি মনেপ্রাণে এটি বিশ্বাস করেন।
তাঁর এই ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সস্তা জ্বালানি এবং উন্নত রোবোটিক্স। মাস্ক বিশ্বাস করেন, এই শক্তিগুলো মিলে উৎপাদনশীলতাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যা আজকের সমস্ত অর্থনৈতিক মডেলকে গুঁড়িয়ে দেবে। সেই পৃথিবীতে সম্পদের অভাব ঘুচে যাবে এবং সম্পদ সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি এমন একটি সুব্যালস্থার কথা চিন্তা করেন, যেখানে মানুষ মজুরি বা পেনশনের ওপর নির্ভর না করে ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’ বা সবার জন্য উচ্চ আয় নিশ্চিত পাবে। তার লক্ষ্য হলো ‘প্রাচুর্য’। এমন এক প্রাচুর্য যেখানে কেবল টিকে থাকার জন্য নয়, বরং মানুষ কোনও আর্থিক দুশ্চিন্তা ছাড়াই সচ্ছলভাবে জীবন কাটাতে পারবে।
মাস্ক সেই প্রাচুর্যের একটি সায়েন্স-ফিকশনধর্মী চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎটি হবে এমন যেখানে যে কেউ যা চায় তা-ই পাবে।’ এর মধ্যে থাকবে ‘আজকের চেয়েও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, যা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সবার জন্য সহজলভ্য হবে’। তিনি আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, ‘পণ্য ও পরিষেবার কোনো অভাব থাকবে না’ এবং মানুষ ‘যেকোনো বিষয়ে যেকোনো কিছু বিনামূল্যে শিখতে পারবে’। এই পরিস্থিতিতে অর্থের শক্তি কমে যাবে কারণ সবকিছুর নাগাল সবার কাছে থাকবে। তার তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন মৌলিক চাহিদা মেটাতে প্রায় কোনো খরচই লাগবে না, তখন অবসরের সঞ্চয় কোনো মানেই রাখবে না।
তবে এখানে একটি ছোট ‘কিন্তু’ আছে, যা মাস্ক নিজেও স্বীকার করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই প্রযুক্তিগত স্বর্গরাজ্যে পৌঁছানোর পথটি বেশ ‘ বন্ধুর’ বা অমসৃণ হতে পারে এবং এতে অনেক বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো জীবনের ‘অর্থ’ নিয়ে তার প্রশ্ন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘এখন, আপনি যদি আপনার পছন্দের সবকিছুই পেয়ে যান, তবে সেটিই কি আপনার কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ? কারণ তখন আপনার চাকরির আর কোনো গুরুত্ব থাকবে না।’ কাজ দীর্ঘকাল ধরে আমাদের পরিচয় এবং জীবনযাত্রাকে গঠন করেছে। কাজ করার প্রয়োজনীয়তা দূর হলে মানুষ হয়তো তাদের সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে পারবে, অথবা তারা সম্পূর্ণ লক্ষ্যহীন হয়ে পড়তে পারে। এই দ্বিধা বা সংকটের কোনো সহজ সমাধান মাস্ক দেননি।
এই ভবিষ্যদ্বাণী মাস্কের ভবিষ্যৎমুখী কোম্পানিগুলোর ট্র্যাক রেকর্ডের সাথে বেশ মিলে যায়। টেসলার মাধ্যমে তিনি ইলেকট্রিক গাড়িকে মূলধারায় এনেছেন। স্পেস-এক্সের মাধ্যমে মহাকাশ ভ্রমণকে নতুন রূপ দিয়েছেন। তার ব্যবসাগুলো স্বয়ংচালিত গাড়ি, হিউম্যানয়েড রোবট, ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস এবং এআই সহকারীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মাস্কের কাছে এই প্রকল্পগুলো আলাদা কিছু নয়। এগুলো একটি বড় ধাঁধার অংশ যার মূল লক্ষ্য মানুষের শ্রমকে স্বয়ংক্রিয় করে তোলা।
তবে এই নতুন বিশ্বের স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো বর্তমান বাস্তবতার সাথে এর কোনো মিল নেই। সাধারণ মানুষ এখন উচ্চমূল্য, ঋণের সুদ এবং নামমাত্র বেতনের সাথে লড়াই করছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষা এখন সাধ্যাতীত। উন্নত চিকিৎসাসেবার কোনো নিশ্চয়তা নেই। নিজের একটি বাড়ির স্বপ্ন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। পরিবার শুরু করা এখন একটি আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। এই প্রেক্ষাপটে, অবসরের সঞ্চয়কে ‘ঐচ্ছিক’ বলাটা অনেকের কাছেই বাস্তববিবর্জিত মনে হতে পারে। বিভিন্ন জরিপ দেখাচ্ছে যে, বিশাল সংখ্যক মানুষ তাদের শেষ বয়সের জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়।
এ কারণেই মাস্কের মন্তব্যগুলো কৌতূহল এবং অস্বস্তি—উভয়ই সৃষ্টি করেছে। তার এই ধারণা পুরোপুরি নির্ভর করছে এআই-এর এমন এক ক্ষমতার ওপর যেখানে কাজ হবে ঐচ্ছিক এবং আয় হবে সুনিশ্চিত। যদি তা সত্যিই ঘটে, তবে পেনশনের কোনো প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু মাস্কের ভবিষ্যদ্বাণী যদি ফলে না যায়, তবে তার কথা শুনে সঞ্চয় বন্ধ করে দেওয়া অনেকের জন্য আর্থিকভাবে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইলন মাস্ক বাজি ধরছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এত বেশি সম্পদ তৈরি করবে যে বার্ধক্যের পরিকল্পনা করাটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিটি হয়তো যেকোনো পরিস্থিতিতেই তার পেনশনের কথা ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষ কি সেই ঝুঁকি নিতে পারে?
(Feed Source: zeenews.com)
