জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণের মূল হোতা এবং আনসার আল ইসলামের শীর্ষ নেতা আলী হাসান উসামার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামিতে যোগদান।
সীমান্তের দুই পারের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়ে এক চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে বাংলাদেশে। আবারও জেগে উঠছে রক্তবীজ। আবারও হায়নার থাবা বাংলাদেশে মাথা চাড়া দিচ্ছে। যে নিষিদ্ধ সংগঠন হাসিনার আমলে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিল, যে জঙ্গি সংগঠনের সমস্ত রকম কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামি লীগ, সেই হিযবুত তাহরীর যার আগে নাম ছিল আনসার আল ইসলাম- বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে আবার ময়দানে নেমেছে। ভোটের মুখে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়েতে ইসলামিতে নাম লিখিয়েছে শীর্ষ জঙ্গি নেতা।
কে এই মোস্ট ওয়ান্টেড জামাত নেতা?
বাংলাদেশের সন্ত্রাস দমন শাখা সূত্রে জানা গিয়েছে, সিলেটের বাসিন্দা আলী হাসান ওসামা রাজবাড়ী জেলার একটি মাদ্রাসা তৈরি করে জঙ্গিদের ডেরা গড়ে তুলেছিলেন। রাজবাড়ী থেকেই বিভিন্ন ওয়াজে জেহাদের ডাক দেওয়ার পাশাপাশি ইউটিউবে উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়াতেন। উসামা যে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তার উপদেষ্টা হলেন মাওলানা মাহমুদুল হাসান গুনবী। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াজ মাহফিলের ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামি জঙ্গিবাদকে ছড়ানোর চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন উসামা। উগ্রবাদ ছাড়ানোর পাশাপাশি জিহাদের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার এবং গাজওয়াতুল হিন্দের মাধ্যমে ভারতের সন্ত্রাসী হামলা চালানোর উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
ইউনূসের অবস্থান:
খোদ ইউনূস সরকার হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশে। ফলত, তারা কোনওরকম রাজনৈতিক কাজ, জমায়েত, বিক্ষোভ বা সমাবেশে অংশ নিতে পারছে না। তাই রাষ্ট্রের চোখে ধুলো দিয়ে জামায়াতে ইসলামিতে যোগ দিয়ে তলায় তলায় নিজের জঙ্গি সমগঠনের কাজ জারি রাখবে মোস্ট ওয়ান্টেড জামাত নেতা।
জামাতে যোগদান:
গত শনিবার ১৭ই জানুয়ারি জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম ও এহসানুল মাহবুব জুবায়েবের উপস্থিতিতে তিনি দলের সহযোগী সদস্য ফর্ম পূরণ করেন। কিন্তু কী ভাবে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতাকে দলে নেওয়া হল, তা নিয়ে মুখ খুলতে চাননি জামায়াতের শীর্ষ নেতারা।
২০১৪ সালের বর্ধমানে ঘটে যাওয়া কুখ্যাত ‘খাগড়াগড় বিস্ফোরণ’ মামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী এবং নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম’-এর শীর্ষ পর্যায়ের নেতা আলী হাসান উসামার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামিতে যোগদান ঘটনায় শোরগোল পড়েছে দুই বাংলাতেই। এই ঘটনা কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খাগড়াগড় থেকে ঢাকা: জঙ্গিবাদের এক দীর্ঘ পথ
২০১৪ সালের ২ অক্টোবর মহালয়ার দিন বর্ধমানের খাগড়াগড়ের একটি বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ কেঁপে উঠেছিল। তদন্তে নেমে এনআইএ (NIA) জানতে পারে, এটি ছিল জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (JMB)-এর একটি গভীর ষড়যন্ত্র। ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকা অন্যতম মূল হোতা, যিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন এবং পরবর্তীতে আল-কায়দা অনুপ্রাণিত জঙ্গি গোষ্ঠী ‘আনসার আল ইসলাম’-এর প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তিনিই এখন জামায়াতের পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে অনেক নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা সংগঠন নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, খাগড়াগড় বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির জামায়াতে যোগদান প্রমাণ করে যে, উগ্রবাদী আদর্শ ও মূলধারার ইসলামপন্থী রাজনীতির মধ্যে যে অদৃশ্য দেয়াল ছিল, তা ক্রমশ ধসে পড়ছে।
জামায়াতে ইসলামির কৌশল ও বিতর্ক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির এবং মূল দলের নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল ও সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়ায় এমন বিতর্কিত ও উগ্রপন্থী ভাবাদর্শের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে খোদ বাংলাদেশেই প্রশ্ন উঠছে। জামায়াত নেতারা বিষয়টিকে ‘শুদ্ধিকরণ’ বা ‘সাধারণ ক্ষমা’ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করলেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এটিকে ভিন্নভাবে দেখছে।
খাগড়াগড় মামলার চার্জশিটে যার নাম ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছিল, সেই ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় লাভ করা ভারতের নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। কারণ, খাগড়াগড় মডিউলের লক্ষ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরি করা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানো।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আনসার আল ইসলামের মতো একটি সামরিক ধাঁচের জঙ্গি সংগঠনের নেতার রাজনৈতিক পুনর্বাসন অত্যন্ত বিপদজনক। এটি জঙ্গি সদস্যদের জন্য একটি ‘নিরাপদ স্বর্গ’ (Safe Haven) তৈরি করতে পারে।
এর ফলে:
স্লিপার সেল সক্রিয় হওয়া: আত্মগোপনে থাকা পুরোনো জেএমবি বা আনসার আল ইসলামের সদস্যরা নতুন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পুনরায় সংগঠিত হতে পারে।
সীমান্ত পারের সন্ত্রাস: খাগড়াগড় মডিউলের যোগাযোগ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছিল। এই নেতারা রাজনৈতিক শক্তি পেলে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচারের পথ ফের সচল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আদর্শিক উগ্রবাদ: গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে উগ্রবাদী নেতাদের মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ তরুণ প্রজন্মকে জঙ্গিবাদের দিকে আরও বেশি প্ররোচিত করতে পারে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপর প্রভাব
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পর শেখ হাসিনা সরকারের সময় ভারত ও বাংলাদেশ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করেছিল এবং বহু জঙ্গিকে একে অপরের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে খাগড়াগড়ের মূল হোতার এমন প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান দিল্লির সাউথ ব্লকের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত সরকার ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা জানিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বর্ধমান বিস্ফোরণটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, এটি ছিল একটি বৃহত্তর জিহাদি নেটওয়ার্কের বহিঃপ্রকাশ। সেই নেটওয়ার্কের মাস্টারমাইন্ড যখন কোনো দেশের শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা বিচারব্যবস্থা ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। খাগড়াগড়ের সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি; তার মধ্যেই এই যোগদান দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদ দমনে এক নতুন জটিলতার সৃষ্টি করল।
আসন্ন দিনগুলোতে এই ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া এই অঞ্চলের নিরাপত্তার গতিপথ নির্ধারণ করবে। সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—এটি কি কেবলই একটি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, নাকি কোনও বড় নাশকতার ব্লুপ্রিন্ট?
(Feed Source: zeenews.com)
