)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বারামতীর সেই অভিশপ্ত বিমান দুর্ঘটনায় কেবল মহারাষ্ট্রের রাজনীতি এক মহীরুহকে হারায়নি, বরং মধ্যবিত্ত পরিবারের এক উজ্জ্বল স্বপ্নেরও সলিল সমাধি ঘটেছে। মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের সঙ্গে যে পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদেরই একজন ২৯ বছর বয়সী কেবিন ক্রু সদস্য পিঙ্কি মালি। উত্তরপ্রদেশের জৌনপুর থেকে মুম্বইয়ের আকাশ ছোঁয়ার যে স্বপ্ন পিঙ্কি দেখেছিলেন, তা বুধবার সকালের আগুনের লেলিহান শিখায় চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।
স্বপ্নের অকাল মৃত্যু: বারামতীর দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন কেবিন ক্রু পিঙ্কি মালি
বুধবার সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট। বারামতী বিমানবন্দরে ল্যান্ডিংয়ের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে অজিত পাওয়ারের চার্টার্ড বিমানটি। সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উদ্ধার হওয়া দেহগুলির মধ্যে একটি ছিল পিঙ্কি মালির। মুম্বইয়ের ওরলি এলাকার সেঞ্চুরি কোয়ার্টারের বাসিন্দা পিঙ্কি ওই উড়ানে কেবিন ক্রু হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে মুম্বইয়ের কোয়ার্টার থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরের পৈতৃক গ্রামেও।
কে ছিলেন এই পিঙ্কি মালি?
পিঙ্কি মালি ছিলেন উত্তরপ্রদেশের জৌনপুর জেলার কেরাকাত তহসিলের ভৈঁসা গ্রামের কন্যা। যদিও তাঁর পরিবার দীর্ঘকাল ধরে মহারাষ্ট্রে বসবাস করছে, কিন্তু মাটির টান তাঁরা কখনও ভোলেননি। থানে থেকে স্কুল ও উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর পিঙ্কি এভিয়েশন সেক্টরে যোগ দেন। তাঁর বাবা শিবকুমার মালি মহারাষ্ট্রের একজন শিবসেনা নেতা। তিন ভাইবোনের মধ্যে পিঙ্কি ছিলেন মেজো। তাঁর দিদি প্রীতি এবং ছোট ভাই করণও মহারাষ্ট্রেই শিক্ষিত। বিবাহিত পিঙ্কি তাঁর অমায়িক ব্যবহার এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠার জন্য পরিচিত ছিলেন।
সেই শেষ কথা: অজিত দাদার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব
শোকাতুর বাবা শিবকুমার মালি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, বুধবার সকালে উড়ান শুরুর আগে পিঙ্কির সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। পিঙ্কি খুব খুশি ছিলেন। ফোনে বাবাকে তিনি বলেছিলেন, ‘বাবা, আমি যখন ফ্লাইটে থাকব, তখন একবার তোমার সঙ্গে অজিত পাওয়ারের কথা বলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।’ কে জানত, এই ইচ্ছাই তাঁর শেষ ইচ্ছা হয়ে থেকে যাবে। টেক-অফের পর পিঙ্কির সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, ছোট ভাই করণ জানান, সকালবেলা পিঙ্কি তাঁকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তিনি বারামতী থেকে নান্দেদে যাবেন। কিন্তু সেই ফোনই ছিল দিদির সঙ্গে শেষ কথা।
জৌনপুরের গ্রামে শোকের মহল
জেলা সদর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে পিঙ্কির পৈতৃক গ্রাম ভৈঁসার বাসিন্দারা খবরটি পাওয়ামাত্র স্তম্ভিত হয়ে যান। গ্রামের বাসিন্দা অশোক সিং জানান, পিঙ্কির বাবা প্রতি বছর গ্রামে আসতেন এবং দুর্গা পুজোর আয়োজন করতেন। মাত্র দেড় বছর আগেই পিঙ্কি সপরিবারে গ্রামে এসেছিলেন। গত বছরই তাঁর ঠাকুরদা বাবু রাম মারা যান, আর এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পরিবারের তরুণী কন্যার এই মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
দুর্ঘটনার কারণ ও শেষ মুহূর্ত
মহারাষ্ট্র বিমান চলাচল দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আবহাওয়া খারাপ থাকায় দৃশ্যমানতা খুব কম ছিল। পাইলট প্রথমবার ল্যান্ডিংয়ের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এবং বিমানটি পুনরায় ওড়ান (Aborted Landing)। এরপর রানওয়ে ১১-তে দ্বিতীয়বার নামার চেষ্টা করার সময় বিমানটি ভারসাম্য হারিয়ে রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এবং মুহূর্তে আগুন ধরে যায়। অজিত পাওয়ার, দুই পাইলট এবং নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় পিঙ্কির।
ওরলির বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার রোল। যে মেয়েটি আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে রোজ কাজে বেরোতেন, তাঁর নিথর দেহ ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পরিবার। পিঙ্কি মালি আজ কেবল একটি নাম নন, বরং বারামতীর এই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার অন্যতম শিকার, যা আবারও ভিআইপি নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ কর্মীদের প্রাণের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনে দিল। মুম্বইয়ে তাঁর শেষকৃত্যের প্রস্তুতি শুরু হলেও, উত্তরপ্রদেশের সেই নিভৃত গ্রাম আজও তাঁর ঘরের মেয়ের স্মৃতিতে চোখের জল ফেলছে।
(Feed Source: zeenews.com)
