চিহ্ন পর্যন্ত নেই, গাজ়ায় উবে গিয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ? নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ

চিহ্ন পর্যন্ত নেই, গাজ়ায় উবে গিয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ? নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ
নয়াদিল্লি: গাজ়ায় নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে। ওই অস্ত্র ব্যবহারের ফলে প্রায় ৩০০০ প্যালেস্তিনীয় নাগরিক কার্যত উবে গিয়েছেন বলে অভিযোগ। নিষিদ্ধ ওই অস্ত্র ব্যবহার করে শুধুমাত্র মানুষকে হত্যা করা যায় না, বরং পুরোপুরি অস্তিত্ব মুছে দেওয়া সম্ভব বলে মত বিশেষজ্ঞদের। (Israel Gaza War)

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera Arabic-এর তদন্তে এই তথ্য় সামনে এসেছে। অভিযোগ, গাজ়ায় প্যালেস্তিনীয়দের উপর নিষিদ্ধ Thermobaric Weapons ব্যবহার করেছে ইজ়রায়েল। আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপও Thermobaric Weapons নিষিদ্ধ করেছে। (Israeli Thermobaric Bomb)

Thermobaric Weapons প্রয়োগে একধাক্কায় ৩৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস  তাপমাত্রা উৎপন্ন হয়, যাতে মানবশরীর একেবারে গলে যায়। আন্তর্জাকিক মহল ওই অস্ত্র নিষিদ্ধ করলেও গাজ়ায় নিরীহ নাগরিকদের উপর ইজ়রায়েল ওই অস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে প্রমাণ মিলেছে।

তদন্তে প্যালেস্তাইনের বাসিন্দা ইয়াসমিন মাহানির কথা উঠে এসেছে। জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে গাজ়ার আল-তাবিন স্কুলে হামলা হয়। ছেলে শাদকে নিরাপদে বের করে আনতে সেখানে ছুটে যান ইয়াসমিন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে স্বামীকে চিৎকার করতে দেখলেও শাদের চিহ্ন পর্যন্ত খুঁজে পাননি। 

সংবাদমাধ্যমে ইয়াসমিন বলেন, “রক্ত-মাংস মাডিয়ে মসজিদে ঢুকি আমি। শাদের কোনও চিহ্ন ছিল না। সমাধিস্থ করার মতো দেহটাও পাইনি।” ইজ়রায়েলের ছোড়া থার্মোবেরিক বোমার আঘাতে শাদ উবে গিয়ে থাকতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। 

তদন্তে দেখা গিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের পর থেকে এখনও পর্যন্ত ২৮৪২ জন প্যালেস্তিনীয় নাগরিকের উপর ওই নিষিদ্ধ অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে। কারণ তাঁরা কার্যত উবে গিয়েছেন। কোথাও কোনও চিহ্ন নেই ওই ২৮৪২ জনের। দেহাংশ, রক্ত পর্যন্ত মেলেনি। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তদন্তের ওই রিপোর্ট প্যালেস্তিনীয় প্রতিরক্ষা বিভাগের তদন্তের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। প্যালেস্তিনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল ‘মানুষ নির্মূল’ করার বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, “উদ্ধার হওয়া দেহ মেলাতে বাড়ি বাড়ি যেতাম আমরা। বাড়িতে চার জন বা পাঁচ জন সদস্য ছিল বলে হয়ত জানাল কোনও পরিবার, ভিতরে গিয়ে দেখতাম তিনটি দেহই অক্ষত রয়েছে। চারিদিক খোঁজাখুঁজি করে, দেওয়ালে রক্তের ছিটে বা মাথার খুলির সামান্য অংশছাড়া যখন কিছু মিলত না, বাকি দু’জনকে ‘উবে যাওয়া’ বলে চিহ্নিত করতাম আমরা।”

গাজ়ার বাসিন্দাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে ইজ়রায়েল বিশেষ একটি রাসায়নিক ব্যবহার করে বলে মত রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ভাসিলি ভাতিগারোভের।  তিনি জানিয়েছেন, থার্মোবেরিক অন্য বিস্ফোরকের মতো শুধু বিস্ফোরণ ঘটায় না, বরং জ্বালানির মেঘ তৈরি করে, যা থেকে ২৫০০-২৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস চাপমাত্রা উৎপন্ন হয় এবং হামলাস্থল বাষ্পীভূত হয়ে যায়।

গাজ়ায় প্যালেস্তিনীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের ডিরেক্টর জেনারেল মুনির আল-বার্শ জানিয়েছেন, এই ধরনের অস্ত্রপ্রয়োগ করলে প্রথমে মানবশরীরের ৮০ শতাংশ জলীয় উপাদান ফুটতে শুরু করে। এর পর টিস্যুগুলি বাষ্পীভূত হয়ে ছাইয়ে পরিণত হয়।  ইজ়রায়েল যে নিষিদ্ধ অস্ত্র গাজ়ায় ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ, তার মধ্যে বেশ কিছু 

আমেরিকায় তৈরি বলেও উঠে এসেছে তদন্তে, সেই তালিকায় রয়েছে MK-84 Hammer, BLU-109 Bunker Buster, GBU-39. এর মধ্যে ৯০০ কেজি MK-84 Hammer প্রয়োগে ৩৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপন্ন হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে BLU-109 Bunker Buster আল-মাওয়াসিতে প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ। একসঙ্গে ২২ জন মানুষ উবে যান বলে দাবি সামনে এসেছে। GBU-39 আল-তাবিন স্কুলে প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। বিল্ডিং অক্ষত থাকলেও ভিতরের সব কিছু শেষ হয়ে যায়। মাহমুদ বাসালের দাবি, আল-তাবিন স্কুলে GBU 39-এর ডানার অংশ পাওয়া গিয়েছিল। 

এ নিয়ে মুখ খুলেছেন আমেরিকার মানবাধিকার কর্মী, Human Rights Watch-এর প্রাক্তন এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর কেনেথ রথ। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, ‘গাজ়ায় এমন অস্ত্র প্রয়োগ করেছে ইজ়রায়েল, যাতে হাজার হাজার প্যালেস্তিনীয় মারা গিয়েছেন। আমেরিকা থার্মাল এবং থার্মোবেরিক অস্ত্র সরবরাহ করেছে, যা ৩৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপন্ন করে ৩০০০ প্যালেস্তিনীয়কে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে’।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অস্ত্রপ্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী যেমন, তেমন যুদ্ধাপরাধও। ২০২৩ সাল থেকে গাজ়ায় যে প্রহার চলছে, তাতে এখনও পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি প্যালেস্তিনীয় মারা গিয়েছেন। যুদ্ধবিরতি চলাকালীনও শত শত মানুষকে হত্যার অভিযোগ সামনে এসেছে। ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, দেশের প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োভ গালান্ত এবং হামাস কমান্ডার মহম্মদ দেইফের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। মহম্মদ দেইফের মৃত্যু হয়েছে।

(Feed Source: abplive.com)