জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: আজকের সাহারা মরুভূমির চেহারা শুষ্কং কাষ্ঠং! বিশ্বের অন্যতম শুষ্ক ও প্রতিকূল অঞ্চল। তবে হাজার হাজার বছর আগে ছবিটা এরকম ছিল না। ৫৫০০ থেকে ১৪৮০০ বছর আগে যা ‘আফ্রিকান হিউমিড পিরিয়ড’ বলে পরিচিত। সে সময়ে বালুর সাগর ছিল না। বরং এটি ছিল হ্রদ, তৃণভূমিতে ভরা এক অঞ্চল। যা কৃষি ও পশুপালনের জন্য অনুকূল ছিল এবং যেখানে মানব বসতি গড়ে উঠেছিল। এক নতুন জেনেটিক গবেষণা বলছে যে, ‘সবুজ সাহারা’ যুগে বসবাস করত এক রহস্যময় জনগোষ্ঠী! যারা আফ্রিকার ইতিহাস সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোকেই নড়িয়ে দিতে পারে। বর্তমানে লিবিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে সে সময় বসবাসকারী এক সম্প্রদায়ের জেনেটিক গঠন প্রত্নতত্ত্ববিদদের জন্য এক অপ্রত্যাশিত ছবি তুলে ধরেছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, সাহারা মরুভূমির তাকরাকোরি পাথরের গুহায় ৭০০০ বছর পুরনো দু’টি মামি পাওয়া গিয়েছে। যা মানব বংশের অজানা শাখা
আধুনিক মানুষের সঙ্গে কোনো মিল নেই
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোলিউশনারি অ্যানথ্রোপোলজির আর্কিওজেনেটিসিস্ট নাদা সালেমের নেতৃত্বে দলটি তাকরাকোরি গুহায় পাওয়া স্বাভাবিক ভাবে সংরক্ষিত ৭০০০ বছরের পুরনো নিওলিথিক যুগের দুই মহিলা মেষপালকের মমির ডিএনএ বিশ্লেষণ করেছেন। সাহারার শুষ্ক জলবায়ুর কারণে জেনেটিক উপাদান সংরক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন হলেও, প্রাপ্ত খণ্ডিত ডিএনএ প্রাচীন জনগোষ্ঠী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছে। গবেষণা বলছে, উভয় মমিই নারীর এবং তারা বিজ্ঞানীদের ভাষায় এক ‘ঘোস্ট পপুলেশন’ বা ‘অদৃশ্য জনগোষ্ঠী’-র অন্তর্ভুক্ত। এই শব্দবন্ধ এমন জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যাদের অস্তিত্ব আধুনিক মানুষের জিনে পাওয়া ক্ষীণ জেনেটিক চিহ্ন থেকে অনুমান করা হয়েছিল, কিন্তু যাদের শারীরিক অবশেষ আগে কখনও পাওয়া যায়নি।
অজানা বংশধারার উপর ভিত্তি করে
তাকরাকোরি ব্যক্তিদের জেনেটিক উৎস উত্তর আফ্রিকা থেকে উদ্ভূত এক অজানা বংশধারার উপর ভিত্তি করে, যা খুব প্রাচীন সময়ে সাব-সাহারান আফ্রিকার সম্প্রদায় থেকে পৃথক হয়ে যায়। বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে তাকরাকোরি জনগণের পূর্বপুরুষরা প্রায় ৫০০০০ বছর আগে সাব-সাহারান আফ্রিকার মানব সম্প্রদায় থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই সময়কালটি সেই সময়ের সঙ্গে মিলে যায় যখন আধুনিক মানুষ আফ্রিকা থেকে বিস্তার শুরু করে। সম্মানিত সায়েন্টিফিক জার্নাল, ‘নেচার’-এ প্রকাশিত প্রবন্ধে আরও দেখানো হয়েছে যে, তাকরাকোরি জনগণ মরক্কোর তাফোরাল্ট গুহায় পাওয়া ১৫০০০ বছর পুরোনো শিকারি-সংগ্রাহকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। উভয় গোষ্ঠীর সাব-সাহারান আফ্রিকার সম্প্রদায়ের সঙ্গে জেনেটিক দূরত্ব প্রায় একই রকম। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সে সময়ে উত্তর আফ্রিকা ও সাব-সাহারান আফ্রিকার মধ্যে জেনেটিক মিথস্ক্রিয়া সীমিত ছিল।
নিয়ান্ডারথাল জিন
গবষেণার আরও একটি আকর্ষণীয় বিষয় হল নিয়ান্ডারথাল জিন। তাফোরাল্ট জনগণের মধ্যে আধুনিক আফ্রিকার বাইরের মানুষের তুলনায় প্রায় অর্ধেক পরিমাণ নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ পাওয়া গেছে, কিন্তু তাকরাকোরি ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার ১০ গুণ কম। তবুও, তাকরাকোরি জনগণের মধ্যে একই সময়ের সাব-সাহারান আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি নিয়ান্ডারথাল জেনেটিক চিহ্ন রয়েছে। গবেষকরা উল্লেখ করেন, তাকরাকোরি জনগণের নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সীমিত ছিল, তবে অঞ্চলের অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় পরোক্ষ যোগাযোগ কিছুটা বেশি থাকতে পারে। লেভান্ত অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে সীমিত জেনেটিক মিশ্রণের চিহ্নও পাওয়া গেছে। এর বাইরে তাকরাকোরি সম্প্রদায় বৃহত্তরভাবে জেনেটিকভাবে বিচ্ছিন্নই ছি
কৃষি ও পশুপালনের বিস্তার
এই আবিষ্কারগুলি ‘সবুজ সাহারা’র কৃষি ও পশুপালনের বিস্তার সম্পর্কে নতুন ব্যাখ্যাই সামনে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হয়েছে যে, মানুষের অভিবাসনের মাধ্যমে এসব চর্চা এই অঞ্চলে পৌঁছেছিল। তবে সালেম ও তাঁর টিম একট ভিন্ন ছবিই দেখাচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে পশুপালন ও কৃষির বিস্তার ঘটে। তাকরাকোরি জনগণের পূর্বপুরুষরা পশুপালন শুরুর আগের শিকারি-সংগ্রাহক সম্প্রদায় থেকে এসেছিলেন। তবুও তারা মৃৎশিল্প, ঝুড়ি বোনা এবং কাঠ ও অস্থি দিয়ে সরঞ্জাম তৈরিতে উন্নত দক্ষতা অর্জন করেছিলেন এবং একই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি বসতি স্থাপন করেছিলেন। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, তাকরাকোরি জনগণ দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকার একটি কারণ ছিল সবুজ সাহারার অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র। হ্রদ, জলাভূমি, বন, সাভান্না ও পার্বত্য অঞ্চল মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত করে থাকতে পারে। গবেষকদের মতে সাহারার বালির নীচে এই হারিয়ে যাওয়া আরও বহু মমি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন লুকিয়ে থাকতে পারে। এসব অবশেষ সাহারা মরুভূমি শুকিয়ে যাওয়ার আগে সেখানে জীবন কেমন ছিল, তার গল্প আরও পূর্ণাঙ্গ করতে পারে।
(Feed Source: zeenews.com)
