
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় জামিন পাওয়া একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিম্ন আদালত বা হাইকোর্ট জামিন মঞ্জুর করার সময় অভিযুক্তকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা দেওয়ার শর্ত আরোপ করে। সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল যে, জামিন মঞ্জুর করার বিষয়টিকে কখনোই টাকা জমা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। আদালতের মতে, এই ধরণের শর্ত কেবল ন্যায়বিচারের পরিপন্থী নয়, বরং এটি জামিন দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দেয়।
মামলার প্রেক্ষাপট
একটি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তের জামিনের আবেদন শুনানি চলাকালীন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অজয় রাস্তোগি এবং বিচারপতি বেলা এম. ত্রিবেদীর ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। মামলাটিতে অভিযুক্তকে জামিন দেওয়ার শর্ত হিসেবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল নিম্ন আদালত। এর বিরুদ্ধেই আবেদনকারী শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: জামিন বনাম অর্থ আমানত
সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছে যে, আদালতগুলো কোনো ‘টাকা আদায়কারী সংস্থা’ (Recovery Agent) নয়। জামিন পাওয়ার শর্ত হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে টাকা জমা দিতে বাধ্য করা মানে হলো পরোক্ষভাবে তাঁর স্বাধীনতার ওপর আর্থিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা।
আদালতের প্রধান পর্যবেক্ষণগুলো হল:
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা: ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। জামিন হলো সেই স্বাধীনতার সুরক্ষা। অর্থের অভাবে কেউ যদি জামিন পেয়েও জেল থেকে বেরোতে না পারেন, তবে তা সংবিধানের লঙ্ঘন।
টাকা আদায়ের মাধ্যম নয়: ফৌজদারি আদালতগুলোকে দেওয়ানি মামলার মতো টাকা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বিশেষ করে প্রতারণা বা আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত মামলায় প্রায়শই দেখা যায় আদালত শর্ত দেয় যে, অর্ধেক টাকা জমা দিলে তবেই জামিন মিলবে। সুপ্রিম কোর্ট বলছে, এটি আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ।
গরিবদের প্রতি বৈষম্য: যদি জামিনের জন্য টাকা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়, তবে সমাজের বিত্তবানরা সহজেই মুক্তি পাবেন, কিন্তু দরিদ্র মানুষরা বিচারের আগেই দীর্ঘ সময় জেল খাটতে বাধ্য হবেন। এটি আইনের চোখে সাম্যের পরিপন্থী।
উচ্চ আদালতগুলোর প্রতি নির্দেশ
শীর্ষ আদালত এর আগেও একাধিকবার (যেমন: সুব্রত রায় বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া বা অন্য মামলাগুলোতে) বলেছে যে, অত্যন্ত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া জামিনের শর্ত হিসেবে নগদ অর্থ চাওয়া উচিত নয়। বিচারপতিরা বলেন, ‘জামিনের শর্ত এমন হওয়া উচিত যা অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি হতে বাধ্য করে, কিন্তু তা যেন তাঁর জন্য অসম্ভব বা নিপীড়নমূলক না হয়ে দাঁড়ায়।’
আদালত স্পষ্ট করেছে যে:
১. অভিযুক্ত যাতে পালিয়ে না যান, তা নিশ্চিত করতে ব্যক্তিগত বন্ড বা শিউরিটি (জামিনদার) চাওয়া যেতে পারে।
২. পাসপোর্ট জমা রাখা বা থানায় হাজিরা দেওয়ার মতো শর্ত আরোপ করা যেতে পারে।
৩. কিন্তু অভিযোগের সত্যতা বিচার না করে কেবল টাকা জমা দেওয়ার ভিত্তিতে মুক্তি দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
রায়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব
এই নির্দেশের ফলে সারা দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে জামিন প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে চেক বাউন্স বা আর্থিক জালিয়াতির মামলায় যেখানে প্রায়ই টাকা জমার শর্ত দেওয়া হতো, সেখানে এখন অভিযুক্তরা এই রায়ের সুবিধা পাবেন। বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের প্রতি সুপ্রিম কোর্টের বার্তা পরিষ্কার—আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, আর জামিন হবে আইনি যুক্তির ভিত্তিতে, আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে নয়।
সুপ্রিম কোর্টের এই অবস্থান পুনরায় প্রমাণ করল যে, ভারতের বিচার ব্যবস্থায় ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ সর্বোপরি। অর্থের মাপকাঠিতে স্বাধীনতা কেনা বা আটকানো যায় না। এই রায় বিচার ব্যবস্থার মানবিক মুখ এবং ন্যায়বিচারের ভারসাম্য রক্ষায় এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
(Feed Source: zeenews.com)
