কায়েশ আনসারি: ভোরের আলো ফোটার আগেই শিউরে ওঠা এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক। শুক্রবার ভোরে কালিম্পং জেলার ২৯ মাইল এলাকায় একটি যাত্রীবাহী ইনোভা গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে সরাসরি তিস্তা নদীতে নিমজ্জিত হয়।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সিকিমের গ্যাংটকের বাসিন্দা দুই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গাড়িতে থাকা আরও দুই যাত্রী গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনার বিবরণ
পুলিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ভোর ৪টে থেকে ৫টার মধ্যে দুর্ঘটনাটি ঘটে। দুর্ঘটনাকবলিত ইনোভা গাড়িটি পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্স এলাকা থেকে সিকিমের গ্যাংটকের দিকে যাচ্ছিল। গাড়িতে থাকা চারজনই সিকিমের বাসিন্দা এবং তারা ডুয়ার্সে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ২৯ মাইল এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং গাড়িটি পাহাড়ের রেলিং ভেঙে সোজা তিস্তা নদীর খরস্রোতা জলে গিয়ে পড়ে।
ভোরবেলা রাস্তা জনশূন্য থাকলেও ইঞ্জিনের বিকট শব্দে স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে আসেন। খবর দেওয়া হয় নিকটস্থ থানায়। অন্ধকার এবং কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে প্রাথমিক উদ্ধারকাজ ব্যহত হলেও পরবর্তীতে পুলিস ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।
হতাহতের পরিচয়
দুর্ঘটনায় মৃত দুই যুবকের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন:
১. কুনাল গুপ্ত (২৩ বছর), বাসিন্দা: গ্যাংটক, সিকিম।
২. পবন কুমার প্রসাদ (২৩ বছর), বাসিন্দা: গ্যাংটক, সিকিম।
এছাড়া গাড়িতে থাকা আরও দুই যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। তারা হলেন আমন গুপ্ত (২৪ বছর) এবং গাড়িচালক অনিকেত গুপ্ত (২৪ বছর)।
স্থানীয়রা এবং পুলিস তাদের উদ্ধার করে দ্রুত রাম্বি হাসপাতালে (Rambi Hospital) ভর্তি করেন। হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, তাদের অবস্থা স্থিতিশীল হলেও মানসিক এবং শারীরিকভাবে তারা অত্যন্ত ট্রমার মধ্যে রয়েছেন।
উদ্ধারকাজ ও প্রশাসনের ভূমিকা
দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই কালিম্পং জেলা পুলিস ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। তিস্তার গভীর জল ও তীব্র স্রোতের মধ্যে গাড়িটিকে শনাক্ত করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রেনের সাহায্যে গাড়িটিকে টেনে তোলার চেষ্টা করা হয়। মৃতদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য শিলিগুড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাবস্থা করা হচ্ছে।
পুলিসের প্রাথমিক অনুমান, সারা রাত গাড়ি চালানোর ফলে চালক হয়ত ক্লান্ত ছিলেন বা ভোরের দিকে তার চোখে ঘুম চলে এসেছিল। এছাড়া ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের এই অংশে বাঁকগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং রেলিংয়ের অবস্থাও খুব একটা মজবুত নয়।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের নিরাপত্তা
এই দুর্ঘটনা আবারও ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শিলিগুড়ি থেকে সিকিম যাওয়ার একমাত্র লাইফলাইন এই রাস্তাটি প্রায়শই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে এবং ভোরে এই রাস্তায় গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে পাহাড়ি রাস্তায় বাঁক নেওয়ার সময় চালকদের সতর্কতা ও রাস্তার পর্যাপ্ত আলোর অভাব প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শোকের ছায়া সিকিমে
দুই তরতাজা প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে সিকিমের গ্যাংটকে। মৃতদের পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছে। বিয়ের আনন্দ উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই এই মৃত্যু সংবাদ পরিবারগুলোর কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিকিম সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের পক্ষ থেকে শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।
ভোরবেলা বা রাতের বেলা পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি যেন চালকের মনোযোগ নষ্ট না করে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
জনসাধারণের মতে, প্রশাসনের উচিত এই বিপজ্জনক মোড়গুলোতে শক্তিশালী গার্ডরেল এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো প্রাণ এভাবে অকালে তিস্তার গর্ভে বিলীন না হয়।
(Feed Source: zeenews.com)
