মৌমিতা চক্রবর্তী: জুলাই গণঅভ্যুথ্থানের পর বাংলাদেশে বয়ে গিয়েছে অপরিসীম অশান্তির বাতাবরণ। হাসিনা সরকারের পতন, বাধ্য হয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দেশত্য়াগ, মৌলবাদী জামাতের অন্তর্বর্তী সরকার হয়ে ক্ষমতা দখল, চরম অশান্তি, হিন্দু-হত্যা, সংবাদপত্রের অফিসে আগুন, উদীচি আর ছায়ানটে- যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পীঠস্থান, তা ভাঙচুর, একের পর এক বাড়িতে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, ছাত্রনেতা ওসমান হাদি ও নিরীহ হিন্দু যুবক দীপু দাসের হত্যাকাণ্ড, আরেক প্রাক্তন প্রধামনন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু-এবং তার হাত ধরেই বিএনপির চেয়ারপার্সন তথা খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের ১৭ বছর পর দেশে ফেরা- বড়দিনের সকালে বিমান থেকেই নেমেই ‘আই হ্য়াভ আ প্ল্যান’- দেশেবাসীর সামনে ঘোষণা করা- এইসব কিছুর মধ্য়ে দিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে হাসিনাবিহীন নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করল বিএনপি। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে চলেছে তারেক রহমান।
কিন্তু বাংলাদেশ নির্বাচনে এত কম ভোট পড়ল কেন? তথ্য যা বলছে, তা চমকে দেওয়ার মতো।
‘নো বোট, নো ভোট’- অর্থাৎ নৌকা নেই, ভোটও নয়— এবারের নির্বাচনে এটাই ছিল নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের অবস্থান। দেশ ছেড়ে চলে আসা শেখ হাসিনাও অডিয়ো বার্তায় দলীয় কর্মীদের সেই বার্তাই দিয়েছেন। তবে দলের নেতারা অনেকেই মনে করছেন, ভোটকেন্দ্রে না যেতে বলা হলেও, কর্মী-সমর্থকদের একটা অংশ ভোট দিতে গিয়েছেন। তার অনেক কারণও রয়েছে। কারও রয়েছে মামলার ভয়, কেউ আবার প্রলোভনে পড়ে ভোট দিতে গিয়েছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় মূলত লড়াই ছিল বিএনপি এবং জামাতে ইসলামির মধ্যে। ফলে ভোটের হারও ৫৯ শতাংশে আটকে গিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ভোট নিয়ে যতই উচ্ছ্বাস দেখান না কেন, এই ভোটে আওয়ামি সমর্থকদের অধিকাংশ যে ভোটকেন্দ্রে যাননি তা মোট ভোটের হারেই স্পষ্ট। ভোট বানচাল করার কোনও পরিকল্পনা ছিল না আওয়ামি নেতাদের। তবুও নিজের দলের সমর্থকদের মধ্যে নেত্রী হাসিনার প্রতি আস্থা যে এতটুকু টলেনি, তা টের পাওয়া গিয়েছে আওয়ামি লিগের শক্ত ঘাঁটিগুলিতে। হাসিনার অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি না দেওয়ায় লক্ষ লক্ষ সমর্থক প্রার্থীহীন হয়ে পড়েছেন এবং অনেকেই ভোট বয়কট করেছেন। নির্বাচনের আগে আওয়ামি লিগ সমর্থক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে ভয় দেখানো হয়েছে। তবুও জনগণ এই ‘জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচন’ প্রত্যাখ্যান করেছে, যার প্রমাণ কম ভোটারের উপস্থিতি।
বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ভোটের হার সবচেয়ে বেশি ছিল ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে। সেবার ভোটের হার ছিল ৮৭.১৩। ভোটের হার সবচেয়ে কম ছিল ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ২৬.৫৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে, ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল যথাক্রমে ৭৪.৯৬ ও ৭৫.৫৯ শতাংশ। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে সেই হার ছিল ৮০.২০ শতাংশ।
তবে এটা স্পষ্ট, এই ভোট হাসিনা না থাকলেও তাঁর ছায়া রয়ে গিয়েছে। এবার আওয়ামী সমর্থকদের মধ্যে যাঁরা ভোট দিতে গিয়েছেন, তাঁরা গণভোটে ‘না’–এর পক্ষে রায় দিয়েছেন। আর তাই আওয়ামি লিগের ঘাঁটি গোপালগঞ্জের তিন আসনে ‘না’ ভোটের জয়জয়কার এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের ভরাডুবি হয়েছে। জেলায় গণভোট দিয়েছেন ৪ লাখ ৫১ হাজার ৪২৭ ভোটার। এর মধ্যে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৬ জন ‘না’ ভোট দিয়েছেন। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৫১৬ জন। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ-১ আসনে গণভোট পড়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ১৪টি। এর মধ্যে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ২৯৮ ভোটার। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৫৪ হাজার ৭১৬টি। গোপালগঞ্জে-২ আসনে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯২ ভোটার গণভোটে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্য ‘না’ ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৯০ জন। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৩৪ হাজার ৩০২ ভোটার। গোপালগঞ্জ-৩ আসনে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ জন গণভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ‘না’ বাক্সে পড়েছে ৯৩ হাজার ৩৬৮ ভোট। ‘হ্যাঁ’ বাক্সে পড়েছে ৩৩ হাজার ৪৯৮ ভোট। একই ছবি বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম-১৩ আসনে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত চতুর্থ গণভোটে অংশ নিয়েছেন ৭ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ৫৬ জন। অর্থ্যাৎ ভোটের হার ৬০.২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটে রায় দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন (৬৮.০৬ শতাংশ)। আর সংস্কার বাস্তবায়নে অসম্মতি জানিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন (৩১.৯৪ শতাংশ)। এই ৩১.৯৪ শতাংশ ভোটার কারা? তা নিয়েই এখন হাসিনাবিহীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তুমুল চর্চা!
(Feed Source: zeenews.com)
