জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দী পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং পিটিআই (PTI) প্রধান ইমরান খানের (Imran Khan) জন্য বড় খবর সামনে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই নেতার স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় তাঁকে রাওয়ালপিন্ডির একটি চক্ষু হাসপাতালে স্থানান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত তাঁকে তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবির সঙ্গে দেখা করার অনুমতিও দিতে পারে বলে জানা গেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্রই ইমরান অনুগামী এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ কর্মীদের মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখা গিয়েছে।
স্বাস্থ্যের অবনতি ও চক্ষু চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা
বেশ কিছুদিন ধরেই আদিয়ালা জেলে বন্দী রয়েছেন ইমরান খান। সূত্রের খবর, গত কয়েক দিনে তাঁর চোখের সমস্যায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। জেলের চিকিৎসকরা প্রাথমিক পরীক্ষা করার পর উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন।
জানা গিয়েছে, রাওয়ালপিন্ডির একটি আই হাসপাতালে (Eye Hospital) তাঁকে স্থানান্তরিত করা হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে সরকার এবং জেল কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইমরান খানের আইনজীবী এবং দলের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হয়েছিল যে, জেলে তাঁকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। জেলের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং বয়সের কারণে তাঁর চোখের ও পিঠের ব্যথার সমস্যা বাড়ছে বলে দাবি করা হয়েছিল। এমতাবস্থায় আদালতের এই ইতিবাচক পদক্ষেপকে ইমরান শিবিরের জন্য বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুশরা বিবির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি
ইমরান খানের জন্য কেবল চিকিৎসার সুযোগই নয়, ব্যক্তিগত দিক থেকেও বড় ঘোষণা এসেছে। দীর্ঘ সময় পর তিনি তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবির সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাতের সুযোগ পেতে পারেন। বুশরা বিবি নিজেও বর্তমানে তোষাখানা মামলা-সহ একাধিক অভিযোগে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন।
পরিবারের সদস্যদের এবং আইনজীবীদের দাবি ছিল, মানবিক খাতিরে দম্পতিকে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হোক। আদালত অবশেষে সেই আরজিতে সাড়া দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি ইমরানের মানসিক শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করবে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক চাপ
ইমরান খানের কারাবাস কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বারবার ইমরানের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পাকিস্তানে সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী অস্থিরতার মাঝে ইমরানের ওপর কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করাকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
পিটিআই সমর্থকরা দাবি করছেন, ইমরান খানকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং জেলের ভেতর থেকে তাঁর লড়াই তাঁকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসার জন্য তাঁকে হাসপাতালের বাইরে আনা হলে সরকারের ওপর থেকে এক ধরণের নৈতিক চাপ কমবে বলে মনে করছে শাহবাজ শরিফ প্রশাসন।
আদিয়ালা জেল থেকে হাসপাতালের পথে: কঠোর নিরাপত্তা
ইমরান খানকে যদি রাওয়ালপিন্ডির হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হবে পুরো এলাকা। পাকিস্তানের রেঞ্জার্স এবং বিশেষ পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে। এর আগে তাঁকে আদালতে পেশ করার সময়ও বিশাল পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল। তাঁর সমর্থকরা যাতে রাস্তায় ভিড় করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটাতে পারে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে প্রশাসন।
কেন এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ?
১. মানবিক দিক: ৭২ বছর বয়সী নেতার স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
২. রাজনৈতিক বার্তা: এটি পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা হতে পারে যে, তারা আইনের পথে হাঁটলেও মানবিকতা ভুলে যাচ্ছে না।
৩. দলীয় মনোবল: বুশরা বিবির সঙ্গে সাক্ষাতের খবর পিটিআই কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করবে।
ইমরান খান পাকিস্তানের রাজনীতির এমন এক চরিত্র, যাঁকে এড়িয়ে যাওয়া বর্তমান প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব নয়। একের পর এক মামলা এবং কারাবাসের মাঝেও তিনি যেভাবে টিকে আছেন, তা নজিরবিহীন। আপাতত রাওয়ালপিন্ডির হাসপাতালে স্থানান্তর এবং স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁর জন্য মরুভূমিতে মরুদ্যানের মতো। তবে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে তাঁকে পুনরায় জেলে ফিরতে হবে নাকি গৃহবন্দী বা অন্য কোনো পথে মুক্তি মিলবে, তা নির্ভর করছে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মোড় এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপর।
সারা বিশ্বের নজর এখন রাওয়ালপিন্ডির দিকে। ইমরান খানের এই ‘অস্থায়ী স্বস্তি’ পাকিস্তানের অস্থির রাজনীতিতে কোনো নতুন সংলাপের পথ প্রশস্ত করে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
(Feed Source: zeenews.com)
