)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাংলা সাহিত্য জগতের এক বিশাল নক্ষত্রপতন। বিংশ শতাব্দীর বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভ এবং আধুনিক কলকাতার জীবন-ভাষ্যকার শংকর আর নেই। দীর্ঘ অসুস্থতার পর চিরবিদায় নিলেন প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিক মণি শংকর মুখোপাধ্যায়, পাঠককুলে যিনি ‘শংকর’ নামেই সমাদৃত। শুক্রবার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট নাগাদ দক্ষিণ কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর জীবনাবসান হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। হাসপাতাল সূত্রে খবর, বার্ধক্যজনিত একাধিক সমস্যায় ভুগছিলেন প্রবীণ এই সাহিত্যিক। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও শুক্রবার আর শেষরক্ষা হল না। তাঁর প্রয়াণের খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাঙালি জীবনে।
১৯৩৩ সালে রানাঘাটে জন্ম মণিভূষণ ভট্টাচার্যের। তবে তাঁর সাহিত্যিক পরিচিতি ‘শংকর’ নামেই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল যখন তিনি কলকাতার শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল বারওয়েলের জুনিয়র ক্লার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই বারওয়েল সাহেবের সাহচর্য এবং কলকাতার কোর্ট-কাছারির অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল তাঁর প্রথম কালজয়ী সৃষ্টি ‘কত অজানারে’।
শঙ্করের কলম ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং মেদহীন। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের একটি মাইলফলক। হোটেলের লবিতে বসে দেখা নানা মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রেম ও প্রতারণাকে তিনি যেভাবে তুলে ধরেছিলেন, তা পাঠককে আজও মুগ্ধ করে। এরপর একে একে এসেছে ‘জন অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘আশা-আকাঙ্ক্ষা’-র মতো উপন্যাস। তাঁর বই অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, ফরাসি থেকে শুরু করে ভারতের প্রায় সবকটি প্রধান ভাষায়।
শঙ্করের লেখনীর গভীরতা মুগ্ধ করেছিল সত্যজিৎ রায়কে। শঙ্করের কাহিনী অবলম্বনেই তিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন অরণ্য’-এর মতো ক্ল্যাসিক সিনেমা। কর্পোরেট জগতের নৈতিক অবক্ষয় আর মধ্যবিত্তের বেকারত্বের হাহাকার শঙ্করের লেখায় যে বাস্তবতায় ধরা দিত, তা তৎকালীন সিনেমা ও সাহিত্যে এক নতুন ভাষা তৈরি করেছিল।
কেবল কথাসাহিত্য নয়, শংকর ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের একনিষ্ঠ অনুরাগী। বিবেকানন্দের অজানা দিকগুলো নিয়ে তাঁর গবেষণা ও গ্রন্থ ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’ পাঠকমহলে বিপুল জনপ্রিয়। খাদ্যরসিক শংকর বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়েও চমৎকার সব বই লিখেছেন। সাহিত্যকৃতির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, শরৎ স্মৃতি পুরস্কার সহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি সম্মাননা। ২০২২ সালে জি ২৪ ঘণ্টা অনন্য সম্মানে জীবনকৃতি সম্মানেও তাঁকে সম্মানিত করা হয়।
এক্স হ্যান্ডেলে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি লেখেন, “বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। ‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’ থেকে ‘জনঅরণ্য’—তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীর আধারে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না-বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাঁর প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও অগণিত গুণগ্রাহীকে আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই”।
কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারও শোকপ্রকাশ করেছেন এক্স হ্যান্ডেলে। তিনি লেখেন, “বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। তাঁর সৃষ্ট অসামান্য সাহিত্যকীর্তি – চৌরঙ্গী, জনঅরণ্য, সীমাবদ্ধ প্রভৃতি বাংলার পাঠকসমাজকে সমৃদ্ধ করেছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর সাহিত্যকর্ম আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। করুণাময় ঈশ্বরের কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার সদগতি কামনা করি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও অসংখ্য গুণমুগ্ধ পাঠকের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা”।
(Feed Source: zeenews.com)
