
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বৃষ্টি নয়, রক্ত ঝরছে? হ্যাঁ, কবি সেই দৃশ্য দেখে বিস্মিত, হতবাক! বিখ্যাত ‘একুশের কবিতা’য় আল মাহমুদ লিখছিলেন– ‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ/ দুপুর বেলার অক্ত/ বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?/ বরকতের রক্ত।/ হাজার যুগের সূর্যতাপে/ জ্বলবে এমন লাল যে,/ সেই লোহিতেই লাল হয়েছে/ কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !’ সেই পবিত্র লোহিত আজকের দিনেই ঝরেছিল ঢাকার মাটিতে। এই ২১ ফেব্রুয়ারি।
আত্ম-অম্বেষা
বাঙালির আত্ম-অম্বেষায় ভাষাচেতনার যে-উন্মেষ ঘটে এখানে, তা ক্রমে ইতিহাস হয়ে যায়। পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে এক ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয়। ১৯৫২ সালের আজকের দিনেই চরম প্রকাশ ঘটে তার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে
কী ঘটে সেদিন? ঐদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে আসেন। পুলিস তাঁদের উপর গুলি চালায়। এতে আবদুস সালাম, আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আবদুল জব্বার ও শফিউর রহমান মারা যান। আহত হন বহু ছাত্র। ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হস্টেলে সমবেত হন। নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদ জানাতে তাঁরা পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি ফের রাজপথে নেমে আসেন। তাঁরা মেডিকেল কলেজ হস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। ভাষা শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেয়।
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি
একুশে ফেব্রুয়ারির এই ঘটনার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন আরও গতিশীল হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে পদ্মাপারে। ৭ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি।
রাষ্ট্রসংঘে দরবার
ইতিহাসের চাকা ঘুরতেই থাকে অবশ্য। ১৯৮৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ পাশ হয়। যা কার্যকর হয় ৮ মার্চ ১৯৮৭ সাল থেকে। আরও পরে ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরের দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাদিন
১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় এবং এতে ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানায়। এসবের ফলে, ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিনটি রাষ্ট্রসংঘের সদস্যদেশগুলিতে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। এরপর থেকেই যেন আসমুদ্রহিমাচলের বাঙালি, সারা পৃথিবীর বাঙালি মনে-মনে বলতে থাকে, ‘বাংলা আমার বচন, আমি/ জন্মেছি এই বঙ্গে।’ যে-কবিতা দিয়ে এই লেখা শুরু হয়েছিল, আল মাহমুদের সেই ‘একুশের কবিতা’তেই আছে এই অপূর্ব লাইন– ‘প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী/ আমায় নেবে সঙ্গে,/ বাংলা আমার বচন, আমি/ জন্মেছি এই বঙ্গে।’
(Feed Source: zeenews.com)
