জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মঙ্গলবার সাতসকাল। কুয়াশাভেজা ভোরের শান্ত পরিবেশ মুহূর্তে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেল ধাতব শব্দের বিকট আর্তনাদে। উত্তরপ্রদেশের হাতরাস জেলায় যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ঘটে গেল এক নারকীয় পথ দুর্ঘটনা। একটি দ্রুতগামী ইকো ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সজোরে ধাক্কা মারল রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক ডবল ডেকার বাসে। এই ঘটনায় কমপক্ষে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও নয়জন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দুর্ঘটনার বিভীষিকা: মঙ্গলবার ভোরবেলা
পুলিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোরে যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমের ঘোরে, তখন সাদাবাদ থানা এলাকার ১৪১ নম্বর মাইলস্টোনের কাছে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটছিল একটি সাদা রঙের ইকো ভ্যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভ্যানটির গতিবেগ এতটাই বেশি ছিল যে চালক হঠাতই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ডবল ডেকার বাসের পিছনে সেটি কার্যত ঢুকে যায়। সংঘর্ষের অভিঘাত এতটাই প্রবল ছিল যে, ভ্যানটি সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে একটি লোহার পিণ্ডে পরিণত হয়।
উদ্ধারকার্য ও স্থানীয়দের তৎপরতা
ভয়াবহ সংঘর্ষের শব্দ পেয়ে ধাবমান অন্যান্য গাড়ির চালক এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরাই প্রথম উদ্ধারকাজে হাত লাগান। ভ্যানের ভেতর থেকে যাত্রীদের বের করা অত্যন্ত দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। স্থানীয়রাই দ্রুত পুলিস খবর দেন।
সাদাবাদ থানার পুলিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে গ্যাস কাটার এবং অন্যান্য সরঞ্জামের সাহায্যে ভ্যানের দরজা ও বডি কেটে যাত্রীদের উদ্ধার করে। তৎক্ষণাৎ সকলকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা ছয়জনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
হতাহতের তালিকা: স্বজনহারা পরিবার
পুলিস সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, মৃতদের পরিচয় পাওয়া গেছে। এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আগ্রার শামশাবাদের বাসিন্দা বিজয়, তাঁর স্ত্রী পিঙ্কি এবং পরিবারের অন্য এক সদস্যা নাথু দেবী। এছাড়া রাজস্থানের ঢোলপুর জেলার বাসিন্দা দিনেশ, তাঁর স্ত্রী সুনিতা এবং লোকেশ নামে এক যুবকও এই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্য থাকায় কান্নার রোল উঠেছে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে।
আহত নয়জনের মধ্যে তিনজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য আগ্রার এসএন মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। বাকি ছয়জন স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে যানজট ও আতঙ্ক
দুর্ঘটনার পর যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের ওই অংশে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল ব্যাহত হয়। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি রাস্তার মাঝখানে পড়ে থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পুলিশ ক্রেন নিয়ে এসে ভ্যান ও বাসটিকে সরিয়ে নিলে কয়েক ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাঁচ এবং রক্ত মাখা ধ্বংসাবশেষ দীর্ঘক্ষণ দুর্ঘটনার ভয়াবহতার সাক্ষী দিচ্ছিল।
পুলিসের তদন্ত ও প্রাথমিক অনুমান
সাদাবাদ থানার পুলিস ইতিমধ্যেই গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, ভ্যানটির গতি নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
তবে পুলিস আরও কয়েকটি দিক খতিয়ে দেখছে:
১. চালকের অবস্থা: ভ্যান চালক কি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন? নাকি ভোরের দিকে তাঁর চোখে ঘুমের ঘোর চলে এসেছিল?
২. যান্ত্রিক ত্রুটি: গাড়ির ব্রেক ফেল বা অন্য কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ হয়েছিল কি না, তাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
৩. বিপজ্জনক পার্কিং: ডবল ডেকার বাসটি রাস্তার পাশে সঠিক নিয়ম মেনে দাঁড়িয়ে ছিল কি না, তা-ও তদন্তের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।
হাতরাসের জেলাশাসক এবং পুলিস সুপার হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসার আশ্বাস দিয়েছেন। মৃতদেহগুলি ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।
দ্রুতগতির মাশুল কতদিন?
যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনার খবর নতুন নয়। কুয়াশা বা অত্যধিক গতিবেগের কারণে বারবার এখানে ঝরে যায় মূল্যবান প্রাণ। মঙ্গলবারের এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিল যে, গতির নেশা কীভাবে নিমেষে একটি সুন্দর পরিবারকে শেষ করে দিতে পারে। যমুনার শান্ত চরে এখন শুধুই স্বজন হারানোদের হাহাকার। পুলিশ ও প্রশাসন বারংবার সর্তক করার পরেও কেন চালকেরা ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘন করছেন, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ না নিলে হয়তো আগামিতেও এমন রক্তস্নাত ভোর দেখবে দেশবাসী।
(Feed Source: zeenews.com)
