)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিহারের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে আধিপত্য বিস্তার করা নীতীশ কুমারের বিদায় ঘিরে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘতম সময় মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকার পর নীতীশ কুমার যখন আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যসভায় যাচ্ছেন, ঠিক তখনই তখন তাঁর নিজের দলের একাংশ এবং একনিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। এই পরিস্থিতির মূলে রয়েছে দলের দুই শীর্ষ নেতা– সঞ্জয় কুমার ঝা এবং রাজীব রঞ্জন সিং ওরফে লালন সিং। নীতীশ সমর্থকদের অভিযোগ, এই দুই নেতাই ‘বিভীষণের’ ভূমিকা পালন করে নীতীশ কুমারকে ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন এবং বিজেপির ‘অপারেশন লোটাস’ সফল করতে সাহায্য করেছেন।
নীতীশ কুমারের ঘোষণা
সোমবার সকালে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করেন নীতীশ কুমার। জানান যে, দেশের চারটি আইনসভা সংস্থায় (বিধানসভা, বিধান পরিষদ, লোকসভা ও রাজ্যসভা) সেবা করার তাঁর দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিহারে নীতীশ জমানার অবসান হতে চলেছে এবং বিজেপির নেতৃত্বাধীন একটি নতুন সরকারের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত দলের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের কাছে ছিল বজ্রপাতের ঘটায়।
পটনায় ব্যাপক প্রতিবাদ ও ‘বিভীষণ’ তকমা
নীতীশ কুমারের এই ঘোষণার পর থেকে পটনায় মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন কয়েক ডজন জেডি(ইউ) কর্মী। বিক্ষোভকারীরা দলের জাতীয় কার্যনির্বাহী সভাপতি সঞ্জয় কুমার ঝা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী লালন সিংয়ের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ তোলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিসকে ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা বন্ধ করতে হয়।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মুসলিম এবং ওবিসি (OBC) সম্প্রদায়ের নেতারাও ছিলেন যারা ঐতিহাসিকভাবে নীতীশ কুমারের প্রধান ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। ‘ভূমি সংঘর্ষ সেনা’-র প্রধান রূপেশ প্যাটেল সরাসরি তোপ দেগে বলেন, ‘যা ঘটছে তা সঞ্জয় ঝা-র কারসাজি। তিনি লালন সিংয়ের সঙ্গে মিলে জেডি(ইউ)কে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। ঝা একজন বিভীষণ, যিনি বিজেপির নির্দেশ মতো কাজ করেছেন।’
অপারেশন লোটাস ও ক্ষমতা দখলের অভিযোগ
জেডি(ইউ) কর্মী সঞ্জয় মেহতার মতে, বিহারে বিজেপির ‘অপারেশন লোটাস’ বা পদ্ম অভিযান এখন সম্পূর্ণ। তিনি দাবি করেন, বিজেপি কৌশলে জেডি(ইউ)-এর কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে। সমর্থকদের দাবি, যে নীতীশ কুমার বিহারে ‘সুশাসন’-এর মডেল তৈরি করেছিলেন, তাঁকে সরিয়ে দেওয়া বিহারের মানুষের সঙ্গে অবিচার।
অত্যন্ত অনগ্রসর জাতি (EBC), নারী এবং পিছিয়ে পড়া মানুষ নীতীশের উন্নয়নের নামেই ভোট দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন সেই জনমতকে উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ক্ষুব্ধ কর্মীদের কণ্ঠে ঝরে পড়ে আবেগ– ‘নীতীশ কুমারকে সরিয়ে দেওয়ার খবরে আমরা সারা রাত ঘুমোতে পারিনি, এমনকি হোলিও পালন করিনি।’
পরিণতি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
বিক্ষোভকারীরা দলের অন্যান্য প্রবীণ নেতা যেমন লালন সরফ এবং বিজয় কুমার চৌধুরীকেও রেহাই দেননি। তাঁদের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলা হয় এবং হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় যে, যারা নীতীশ কুমারের রাজ্যসভায় যাওয়ার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন, তাঁদের কর্মীবাহিনীর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নীতীশ কুমারের রাজ্যসভায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিহারের রাজনীতিতে জেডি(ইউ)-এর শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে নীতীশের অনুগত ভোটাররা যদি মনে করেন যে তাঁদের নেতাকে অন্যায়ভাবে সরানো হয়েছে, তবে আগামী নির্বাচনে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।
নীতীশ কুমারের বিদায় মানে কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তন, যা নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই এখন গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
নীতীশ কুমার জানিয়েছেন যে, নতুন বিহার সরকার তাঁর সবরকম সহযোগিতা পাবে, কিন্তু তাঁর সমর্থকরা এই আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন। সঞ্জয় ঝা এবং লালন সিংয়ের প্রতি এই তীব্র ঘৃণা ও ‘বিভীষণ’ তকমা বিহারের রাজনীতিতে জেডি(ইউ)-এর ভবিষ্যৎ এবং দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপর বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে। বিজেপি বিহারের শাসনভার হাতে নিলেও, নীতীশ সমর্থকদের এই জনরোষ কী ভাবে সামাল দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
(Feed Source: zeenews.com)
