Pakistan Lockdown amid Fuel Shortage: ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে জ্বালানি: সংসদদের বেতন কমছে ২৫%, সপ্তাহে এবার কাজ করতে হবে মাত্র চার দিন

Pakistan Lockdown amid Fuel Shortage: ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে জ্বালানি: সংসদদের বেতন কমছে ২৫%, সপ্তাহে এবার কাজ করতে হবে মাত্র চার দিন

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: পাকিস্তান বর্তমানে তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অভাব এবং জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত দেশটিকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ একগুচ্ছ কঠোর ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল সোমবার রাতে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দেশকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে এখন ‘যুদ্ধকালীন কৃচ্ছ্রসাধন’ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ইরান, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার আঁচ সরাসরি গিয়ে লেগেছে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় পাকিস্তান সরকার দেশে কার্যত জরুরি অবস্থা বা লকডাউন সদৃশ বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সোমবার রাতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জ্বালানি সাশ্রয় পরিকল্পনা কার্যকর করা হচ্ছে।

এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের বিশেষ ত্যাগের আহ্বান।

সরকারি কর্মঘণ্টা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বড় পরিবর্তন

জ্বালানি সাশ্রয় এবং বিদ্যুৎ খরচ কমাতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, এখন থেকে দেশটির সকল সরকারি অফিস সপ্তাহে মাত্র চার দিন খোলা থাকবে। বাকি দিনগুলোতে অফিস বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাঁচানোর চেষ্টা করা হবে।

একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় এবং যাতায়াতজনিত জ্বালানি খরচ কমাতে আগামী দুই সপ্তাহের জন্য দেশের সকল স্কুল ও কলেজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পাঠদান প্রক্রিয়া সচল রাখতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সশরীরে উপস্থিতির বদলে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ওয়ার্ক ফ্রম হোম এবং জনবল নিয়ন্ত্রণ

বেসরকারি খাতকেও এই কৃচ্ছ্রসাধন প্রক্রিয়ায় শামিল করার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে তাদের ৫০ শতাংশ কর্মীর জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাসা থেকে কাজ নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে রাস্তায় যানবাহনের চাপ কমবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কিছুটা লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রী ও এমপিদের বেতন কর্তন: ত্যাগের নতুন দৃষ্টান্ত

নীতিনির্ধারকদের নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ঘোষণা করেছেন যে:

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসে বিধিনিষেধ

জ্বালানি খরচ ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন:

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ: আগামী দুই সপ্তাহের জন্য দেশের সকল স্কুল ও কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইনে কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বেতনহীন মন্ত্রীসভা: কোনও ফেডারেল মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী আগামী দুই মাস কোনো বেতন পাবেন না।

সংসদ সদস্যদের বেতন হ্রাস: সকল সংসদ সদস্যের (MP) মাসিক বেতন ২৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

চার দিনের কর্মসপ্তাহ: জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যাংক ব্যতীত সকল সরকারি অফিস সপ্তাহে মাত্র চার দিন কাজ করবে। বাকি দিনগুলোতে অফিস বন্ধ থাকবে।

বাসা থেকে কাজ (WFH): যাতায়াত কমাতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের অন্তত ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাসা থেকে কাজ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা: সকল ফেডারেল ও প্রাদেশিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিদেশ সফরের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ছাড়া কোনো সরকারি অর্থ খরচ করে বিদেশ ভ্রমণ করা যাবে না।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর বিশেষ কর ও বেতন 

সাধারণ জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে উচ্চ আয়ের কর্মকর্তাদের ওপর দায়ভার চাপানোর নীতি গ্রহণ করেছে পাকিস্তান সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০ গ্রেড এবং তার ওপরের সকল সরকারি কর্মকর্তা—যাদের মাসিক আয় ৩ লাখ রুপির বেশি, তাদের দুই দিনের বেতন কেটে নেওয়া হবে। এই অর্থ সরাসরি জনকল্যাণমূলক কাজে এবং সংকট মোকাবিলায় ব্যয় করা হবে। এছাড়া সামগ্রিকভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরগুলোর পরিচালনা ব্যয় ২০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জ্বালানি খাতে কৃচ্ছ্রসাধন

জ্বালানি আমদানিতে পাকিস্তানের কোষাগার থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যায়। এটি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী আগামী দুই মাসের জন্য সকল সরকারি ও দাপ্তরিক যানবাহনের জ্বালানি বরাদ্দ সরাসরি ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এখন থেকে সরকারি গাড়িগুলো শুধুমাত্র অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে এবং নির্ধারিত সীমার মধ্যে জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে।

ইতিহাসে সর্বোচ্চ জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি
সরকার কেবল বিধিনিষেধ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং পেট্রোল ও ডিজেলের দামে বড় ধরনের ‘বোমা’ ফাটিয়েছে। একদিনেই লিটার প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে রেকর্ড ৫৫ পাকিস্তানি রুপি (PKR)।

নতুন দাম: হাই-স্পিড ডিজেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি লিটার ৩৩৫.৮৬ রুপি এবং পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে ৩২১.১৭ রুপি।
এই বৃদ্ধি পাকিস্তানের ইতিহাসে একক সময়ে সর্বোচ্চ, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।

কেন এই কঠোর পদক্ষেপ?

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো যুদ্ধের চেয়ে কম নয়। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ মানুষের ওপর যখন দ্রব্যমূল্যের চাপ বাড়ছে, তখন দেশের শাসক গোষ্ঠী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিলাসী জীবনযাপন চলতে পারে না। এই ‘যুদ্ধকালীন কৃচ্ছ্রসাধন পরিকল্পনা’ মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (IMF) এটি বোঝানোর চেষ্টা যে, পাকিস্তান সরকার স্বয়ং ব্যয় কমাতে বদ্ধপরিকর।

প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের এই ঘোষণা পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলেও, অর্থনীতিবিদরা একে একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। মন্ত্রীদের বেতন বন্ধ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের রাজকোষে বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় করবে। তবে দুই মাসের এই বিশেষ পরিকল্পনা কতটুকু সুফল আনে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

পাকিস্তানের এই পরিস্থিতি মূলত একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকটের স্থানীয় প্রভাব। অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক জানিয়েছেন, বিশ্ববাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত এই কৃচ্ছ্রসাধন নীতি বজায় থাকবে। বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধকালীন অর্থনীতি’র সাথে তুলনা করছেন বিশ্লেষকরা, যেখানে টিকে থাকাই এখন পাকিস্তানের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাকিস্তান এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি—উভয় সংকট মোকাবিলায় কঠোর লকডাউন ও ব্যয় সংকোচনই এখন সরকারের একমাত্র অস্ত্র।

দেশ বাঁচাতে বিলাসিতা ত্যাগ করে কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটছে পাকিস্তান। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু হওয়া এই ত্যাগ সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফেরাতে পারে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

(Feed Source: zeenews.com)