জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি (Middle East Crisis) এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে চলা ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রেশ এখন ছড়িয়ে পড়েছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতেও। সম্প্রতি বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি বহুতলে– ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ২৯ বছর বয়সী এক মহিলার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে। সঙ্গে অন্তত আটজন আহত হয়েছেন। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এই ঘটনাকে ‘নির্লজ্জ ইরানি আগ্রাসন’ হিসেবেই দেখছে।
ঘটনার বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতি
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মানামার জনবহুল একটি আবাসিক এলাকায় এই হামলা চালানো হয়। হামলার সময় বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং একটি বহুতল আবাসিক ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ২৯ বছর বয়সী এক বাহরাইনি মহিলার মৃত্যু হয়। আহত আটজনকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, এটি একটি অ্য়াপার্টমেন্টের ওপর সরাসরি হামলা, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপট
এই হামলার সূত্রপাত হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ প্রায় ১,২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। এই হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান গত ১২ দিন ধরে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাহরাইনের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার এবং সৌদি আরবেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। দুবাই এবং আবুধাবিতে নিয়মিত বিরতিতে বিমান হামলার সাইরেন শোনা যাচ্ছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা গত কয়েক দিনে ইরানের ছোঁড়া শতাধিক ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন ইন্টারসেপ্ট বা ধ্বংস করেছে। বুধবার সকালেও কাতারের দোহায় বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে।
জ্বালানি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
ইরান এই হামলার মাধ্যমে মূলত বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। বাহরাইনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ‘বাপকো এনার্জি’ (Bapco Energies) তাদের আল-মা’আমির শোধনাগারে হামলার পর ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ (অনিবার্য পরিস্থিতি) ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, আবুধাবির রুওয়াইস শিল্প কমপ্লেক্সেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা ওই অঞ্চলের তেল পরিশোধন ও রপ্তানি কার্যক্রমকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বৈশ্বিক শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে। বাহরাইন ও আমিরাত সরকার জনগণকে ঘরে থাকার এবং জানালার পাশ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমার অস্থিরতার কারণে দুবাই, আবুধাবি, দোহা এবং বাহরাইনের ফ্লাইট বাতিল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধকে একটি ‘অসংলগ্ন রণকৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করলেও পরিস্থিতির উন্নয়নে কূটনৈতিক তৎপরতা খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, যতদিন প্রয়োজন তারা এই হামলা চালিয়ে যাবেন।
মানামার আবাসিক ভবনে এই হামলা প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সাধারণ বেসামরিক মানুষের জীবনের ওপরও এর কালো ছায়া পড়েছে। বাহরাইনের মতো একটি শান্তিপ্রিয় দেশে সাধারণ নারীর মৃত্যু এবং আবাসিক এলাকায় ধ্বংসলীলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায় যদি দ্রুত কোনো যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার পথ বের করতে না পারে, তবে এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
(Feed Source: zeenews.com)
