)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: আরব দুনিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমোজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) ফের বড়সড় নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের আঁচ এবার সরাসরি এসে লাগল ভারতগামী এক পণ্যবাহী জাহাজে। বুধবার (১১ মার্চ) গুজরাটের মুন্ড্রা বন্দরের অভিমুখে রওনা দেওয়া থাইল্যান্ডের একটি বিশাল পণ্যবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে অজ্ঞাত স্থান থেকে প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলার জেরে জাহাজটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং সেটির কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চরম উত্তেজনার মধ্যে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালিয়ে জাহাজে থাকা ২৩ জন নাবিকের মধ্যে ২০ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ: মাঝ সমুদ্রে অতর্কিত হামলা
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ‘ব্যাংকক পোস্ট’ ও ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী ওই পণ্যবাহী জাহাজটির নাম ‘ময়ূরী নারী’ (Mayuree Naree)। জাহাজটি রাসায়নিক ও শিল্পজাত কাঁচামাল নিয়ে ভারতের গুজরাট রাজ্যের একটি বন্দরের দিকে আসছিল। বুধবার যখন এটি ওমানের উত্তর উপকূল থেকে প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল দূরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমোজ প্রণালী অতিক্রম করছিল, ঠিক তখনই অজ্ঞাতপরিচয় কোনো পক্ষ থেকে দুটি শক্তিশালী প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জাহাজটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও যাতায়াতকারী অন্যান্য জাহাজের সূত্রমতে, প্রথম প্রজেক্টাইলটি সরাসরি জাহাজের ইঞ্জিনে আঘাত করে। এর ফলে মুহূর্তের মধ্যে ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায় এবং আকাশচুম্বী ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পরেই দ্বিতীয় প্রজেক্টাইলটি জাহাজের উপরের ডেকে আঘাত হানে, যার ফলে মূল কাঠামোতে ফাটল দেখা দেয়। মাঝ সমুদ্রে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা জাহাজটি থেকে নাবিকরা দ্রুত সাহায্যের জন্য আন্তর্জাতিক এসওএস (SOS) বার্তা পাঠান।
উদ্ধার অভিযান: ওমান নৌবাহিনীর তৎপরতা
হামলার খবর পাওয়ার পরপরই রয়্যাল থাই নেভি (Royal Thai Navy) এবং ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO) সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা রয়্যাল নেভি অফ ওমান (Royal Navy of Oman) যুদ্ধজাহাজ নিয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করে। জাহাজে মোট ২৩ জন নাবিক ছিলেন। ওমান নৌবাহিনীর কমান্ডোরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে জ্বলন্ত জাহাজ থেকে ২০ জন নাবিককে সফলভাবে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তবে সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনও ৩ জন নাবিক জাহাজের ভেতর আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের শারীরিক অবস্থা বা জাহাজটির বর্তমান স্থিতিশীলতা সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
জাহাজের পরিচয় ও অবস্থান নিশ্চিতকরণ
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) নম্বর, জাহাজের কাঠামো এবং সংরক্ষিত পুরনো ছবির সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে যে আক্রান্ত জাহাজটি থাইল্যান্ডের ‘ময়ূরী নারী’। প্রায় ১৭৮ মিটার দৈর্ঘ্যের এবং ৩০ হাজার টন বহনক্ষমতাসম্পন্ন এই জাহাজটির মালিকানা রয়েছে ‘প্রেসিয়াস শিপিং’ (Precious Shipping) নামক এক নামী থাই সংস্থার হাতে। মেরিটাইম ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ১১ মার্চ জাহাজটির শেষ অবস্থান ধরা পড়ে ওমান উপকূলের খুব কাছে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। থাই নৌবাহিনীর প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, হামলার পর জাহাজের চারপাশে লাইফ রাফট (Life Raft) ভাসছে, যা থেকে বোঝা যায় নাবিকরা প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিলেন।
হরমোজ প্রণালীর গুরুত্ব ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই হরমোজ প্রণালীটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ধমনী। বিশ্বের মোট উত্তোলিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই সরু পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়। ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যকার বর্তমান চরম সংঘাত এবং লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতার প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলে নৌ-চলাচল এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও এই হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো দেশ বা সশস্ত্র গোষ্ঠী স্বীকার করেনি, তবে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরেই এই ‘পরিকল্পিত আঘাত’ হানা হয়েছে।
ভারতের অর্থনীতির ওপর প্রভাবের কালো মেঘ
এই ঘটনা ভারতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক হওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে:
১. জ্বালানি নিরাপত্তা: ভারতের আমদানিকৃত খনিজ তেলের একটি বড় অংশ এই হরমোজ প্রণালী পথ দিয়েই আসে। এই পথে হামলা বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমবে, যার ফলে ভারতেও পেট্রোল-ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
২. শিল্পে কাঁচামালের অভাব: ‘ময়ূরী নারী’ জাহাজটি সরাসরি গুজরাটের দিকে আসছিল রাসায়নিক কাঁচামাল নিয়ে। ভারতগামী জাহাজে হামলা মানেই দেশীয় শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সাপ্লাই চেইনে বড়সড় ধস নামা।
৩. বিমা ও পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি: সমুদ্রপথে ঝুঁকি বাড়লে বিমা সংস্থাগুলো ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে পরিবহণ খরচ বা ‘ফ্রেইট কস্ট’ (Freight Cost) হু হু করে বেড়ে যায়, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হবে সাধারণ ক্রেতাকে বাড়তি দামের মাধ্যমে।
নৌবাহিনীর সতর্কতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
হামলার খবর পাওয়ার পরই ভারতীয় নৌবাহিনী এবং উপকূলরক্ষী বাহিনী আরব সাগরের উত্তর অংশে তাদের নজরদারি একধাক্কায় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর থেকে আসা ভারতীয় পতাকাবাহী এবং ভারতগামী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা প্রদানের জন্য নৌবাহিনীর শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর কাপুরুষোচিত হামলা’ এবং ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। থাইল্যান্ড সরকার তাদের নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওমানের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
গভীর অনিশ্চয়তার পথে বিশ্ব বাণিজ্য
মাঝ সমুদ্রে পণ্যবাহী জাহাজের ওপর এই হামলা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ভয়াবহ বিস্তৃতির একটি পরিষ্কার সতর্কবার্তা। লোহিত সাগরের পর এবার হরমোজ প্রণালীর মতো স্পর্শকাতর জায়গায় হামলা শুরু হওয়ায় ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে।
এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই ধরনের দস্যুবৃত্তি বা সামরিক হামলা রুখতে রাষ্ট্রপুঞ্জ ও বিশ্ব শক্তিগুলো সম্মিলিতভাবে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ভারত যদি তার আমদানি-রপ্তানি সচল রাখতে চায়, তবে তাকে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে নৌ-নিরাপত্তায় আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হতে পারে। আপাতত ২০ জন নাবিক রক্ষা পেলেও, যে বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার রেশ অনেকদিন স্থায়ী হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
(Feed Source: zeenews.com)
