জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর অধিকার এবং মর্যাদা নিয়ে এক ঐতিহাসিক ও কড়া পর্যবেক্ষণ দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। একটি বিবাহবিচ্ছেদ মামলার শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, বিয়ের অর্থ এই নয় যে স্বামী নিজের ঘরে একজন ‘পরিচারিকা’ নিয়ে এসেছেন। বিচারপতি বি.ভি. নাগরত্ন এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহ-র ডিভিশন বেঞ্চ এই মন্তব্য করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
মামলা– এক দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত, যেখানে স্বামী তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘নিষ্ঠুরতা’ বা ক্রুয়েলটির (Cruelty) অভিযোগ তুলেছিলেন। স্বামীর দাবি ছিল, তাঁর স্ত্রী ঘরের কাজকর্মে যথেষ্ট পটু নন এবং পরিবারের দেখাশোনা ঠিকমতো করছেন না। এই যুক্তিতেই তিনি বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু শুনানির সময় স্বামীর এই মানসিকতা দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালত।
আদালতের কঠোর ভর্ৎসনা
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি বি.ভি. নাগরত্ন স্বামীকে লক্ষ্য করে বলেন, “আপনি একজনকে বিয়ে করেছেন মানে এই নয় যে আপনি আপনার ঘরের জন্য একজন পরিচারিকা নিয়োগ করেছেন। স্ত্রী আপনার বাড়ির কাজ করার জন্য কোনো বেতনভোগী কর্মচারী নন।” আদালত আরও জানায় যে, অনেক পুরুষই মনে করেন বিয়ের পর স্ত্রী কেবল তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের সেবা করবেন, যা একটি অত্যন্ত পশ্চাৎপদ এবং ভুল ধারণা।
আদালতের মতে, দাম্পত্য সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা এবং সহমর্মিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। যদি স্বামী মনে করেন যে স্ত্রী কেবল গৃহস্থালির কাজ করার একটি যন্ত্র, তবে সেই সম্পর্ক সুস্থ হতে পারে না। আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে, বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী তাঁর স্বামীর জীবনসঙ্গী হন, তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা পরিচারিকা নন।
লিঙ্গ বৈষম্য ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ ভারতের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজও অনেক শিক্ষিত পরিবারেও মনে করা হয় যে ঘরের সব কাজ কেবল নারীরই দায়িত্ব। বিচারপতিরা বলেন যে, এই ধরণের মানসিকতা আদতে এক ধরণের লিঙ্গ বৈষম্য। আদালত জানায়, বাড়ির কাজে স্বামীরও সমান অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন এবং শুধুমাত্র কাজের অজুহাতে কোনো স্ত্রীকে মানসিক বা সামাজিকভাবে হেয় করা যায় না।
নিষ্ঠুরতার সংজ্ঞা ও আইনি ব্যাখ্যা
স্বামী পক্ষ থেকে যখন ‘নিষ্ঠুরতা’র অভিযোগ তোলা হয়, তখন আদালত পাল্টে প্রশ্ন তোলে যে—গৃহস্থালির কাজ না করতে পারা কি সত্যিই নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পড়ে? আদালতের মতে, এটি কোনোভাবেই বিবাহবিচ্ছেদের শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে না। বরং স্বামীর এই ধরণের প্রত্যাশা রাখাটাই স্ত্রীর প্রতি এক ধরণের মানসিক নির্যাতন।
সর্বোচ্চ আদালতের বার্তা
সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া অবস্থান সমাজে নারীর মর্যাদা রক্ষায় একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালত বারংবার জোর দিয়ে বলেছে যে, বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন যা দুই ব্যক্তির সমান অধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো পক্ষই অন্য পক্ষকে নীচু করে দেখতে পারে না বা শোষণের মানসিকতা নিয়ে চলতে পারে না।
বিচারপতিদের এই ঐতিহাসিক মন্তব্য কেবল একটি মামলার রায় নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে এক জোরালো সতর্কবার্তা। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত এবং দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্ব কতখানি, তা এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আবারও প্রতিষ্ঠিত হলো। আদালত স্পষ্ট করে দিল যে, গৃহস্থালির কাজের বাহানা দিয়ে কোনো স্ত্রীকেই অসম্মান করা চলবে না।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত সংবাদ ও আদালতের পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। কোনও আইনি বিষয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কপিই প্রামাণ্য বলে গণ্য হবে।
(Feed Source: zeenews.com)
