
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: আমেরিকা এবং ইরানের যুদ্ধের মধ্যেই চাঞ্চল্যকর তথ্য। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘উইয়ন’ (WION)-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আমেরিকার ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে ইরানের পরবর্তী শাসক হিসেবে মসনদে বসাতে চাইছে।
পলিটিকো-সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত এই চাঞ্চল্যকর খবরটি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে যে, হোয়াইট হাউস কি ইরানে ‘নিজেদের লোক’ বসাতে চাইছে?
এই প্রশ্নটা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্দরে ফিসফাস নয়— প্রায় বিস্ফোরণের আকার নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যখন ধীরে ধীরে শুধু গোলাবারুদ নয়, ক্ষমতার পুনর্গঠন-এর খেলায় পরিণত হচ্ছে– ঠিক তখনই সামনে এল এই বিস্ফোরক রিপোর্ট।
ওয়াশিংটন নাকি চুপিসারে খুঁজছে ইরানের ভিতরেই ‘নতুন মুখ’। আর সেই তালিকায় উঠে এসেছে এক চেনা নাম—
ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন।
যিনি একসময় আমেরিকার বিরুদ্ধে আগুন ঝরানো ভাষণে শিরোনামে ছিলেন, তাকেই এখন ‘ওয়ার্কেবল পার্টনার’ হিসেবে দেখছে হোয়াইট হাউসের একাংশ।
প্রেক্ষাপট: ইরানের রাজনৈতিক শূন্যতা ও ট্রাম্পের কৌশল
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রয়াণ (বা বর্তমান পরিস্থিতিতে তার অনুপস্থিতি) এবং তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের ফলে ইরানে এক ধরণের নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতা পূরণে ট্রাম্প প্রশাসন এমন একজনকে খুঁজছে যিনি বর্তমান ব্যবস্থার অংশ হয়েও আমেরিকার সাথে এক ধরণের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবেন।
জানানো হয়েছে, হোয়াইট হাউস গোপনে ৬৪ বছর বয়সী গালিবাফকে একজন কার্যকর অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করছে। ট্রাম্পের মতে, গালিবাফ এমন একজন ব্যক্তি যিনি ইরানের বর্তমান ‘শাসনব্যবস্থার ভেতর থেকেই’ (Someone from within) উঠে আসা এক জনপ্রিয় মুখ। যদিও গালিবাফ অতীতে একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তবুও ট্রাম্পের টিম মনে করছে, কূটনীতির মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে পৌঁছাতে গালিবাফ হতে পারেন প্রধান তুরুপের তাস।
কেন গালিবাফ ‘হট অপশন’?
কারণটা সরল নয়, বরং ভয়ঙ্করভাবে কৌশলী। মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইরানের রাজনীতিতে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি এর আগে তেহরানের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন। তার এই সামরিক এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় তাকে ইরানের কট্টরপন্থী এবং প্রযুক্তিবিদ—উভয় পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে এখন অস্থিরতা—হত্যা, হামলা, ক্ষমতার শূন্যতা। এই পরিস্থিতিতে গালিবাফ একদিকে IRGC-ঘনিষ্ঠ হার্ডলাইনার, অন্যদিকে দরকারে প্র্যাগম্যাটিক ডিলমেকার।
অর্থাৎ, ‘কঠোর মুখ, কিন্তু দরজাটা খোলা’—এই প্রোফাইলটাই এখন আমেরিকার দরকার।
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে:
১. পদ্ধতিগত ধারাবাহিকতা: গালিবাফকে সমর্থন করার অর্থ হলো বর্তমান ইরানি কাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস না করে তার সংস্কার করা।
২. অর্থনৈতিক স্বার্থ ও তেলের বাজার: লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী। ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে সামরিক হামলা পাঁচ দিনের
জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন, যাতে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সম্ভব হয়। গালিবাফ এই আলোচনায় ইরানের পক্ষ থেকে একটি মধ্যপন্থী কিন্তু শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আসল খেলা কোথায়?
এটা শুধু কূটনীতি নয়। এটা রেজিম-শেপিং।
আমেরিকার কাছে এখন তিনটে অপশন:
১. যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া
২. পুরনো নেতৃত্বের সঙ্গে ডিল
৩. নতুন ‘গ্রহণযোগ্য’ মুখ তুলে আনা
তৃতীয় অপশনটাই সবচেয়ে নীরব, কিন্তু সবচেয়ে গভীর।
কারণ—
যুদ্ধ জিতে ভূখণ্ড দখল করা যায়, কিন্তু রাজনীতি জিততে গেলে দরকার ‘লোক বসানো’
দ্বিমুখী অবস্থান ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া
তবে এই প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। খোদ গালিবাফ এই খবরকে ‘ফেক নিউজ’ বা মিথ্যা খবর হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এসব প্রচারণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের জনগণের শত্রু এবং এই ধরণের জল্পনা কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ সংহতি নষ্ট করার চক্রান্ত।
অন্যদিকে, ইসরায়েল এই বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নেতানিয়াহু সরকার ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার সাথে যুক্ত যে কাউকেই তারা টার্গেট করতে দ্বিধা করবে না। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশও ট্রাম্পের এই ‘লেনদেনমূলক’ রাজনীতি বা ট্রানজ্যাকশনাল কূটনীতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, IRGC-এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা গালিবাফ শেষ পর্যন্ত মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরান ইতোমধ্যে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’ এর মাধ্যমে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে গালিবাফকে নেতৃত্বের বিকল্প হিসেবে ভাবার বিষয়টি নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে এখন শাসিত পরিবর্তনের (Regime change from within) দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য পরিকল্পনা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর। গালিবাফ বর্তমানে ইরানের ত্রি-দলীয় পরিষদের (triumvirate) অন্যতম সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক বিষয়গুলো দেখভাল করছেন। যদি পর্দার আড়ালে কোনো আলোচনা সত্যিই থেকে থাকে, তবে তা কেবল ইরানের ভাগ্য নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের মানচিত্র বদলে দিতে পারে।
ব্যাকচ্যানেল, ব্লাফ আর বাস্তব
রিপোর্ট বলছে, সরাসরি নয়—
মিশর, তুরস্ক, পাকিস্তানের মতো দেশের মাধ্যমে চলছে কথাবার্তা। অন্যদিকে গালিবাফ প্রকাশ্যে সব অস্বীকার করছেন।
কিন্তু ইতিহাস বলে— যেখানে প্রকাশ্যে অস্বীকার, সেখানেই আড়ালে সবচেয়ে বেশি আলোচনা।
বড় প্রশ্নগুলো হল– আমেরিকা কি সত্যিই ইরানে ‘পছন্দের নেতা’ বসাতে চাইছে? গালিবাফ কি শুধু আলোচনার মুখ, না ভবিষ্যতের মুখ? আর সবচেয়ে বড়– ইরানের জনগণ কোথায় এই খেলায়?
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন আর শুধু মিসাইল বা তেলের দাম নয়। এটা ক্ষমতার দাবার ছক—যেখানে চালগুলো চোখে পড়ে না, কিন্তু ফলাফল বদলে দেয় পুরো বোর্ড।
আর সেই বোর্ডে,
আজকের সবচেয়ে বড় চাল—
শত্রুকেই সম্ভাব্য নেতা হিসেবে ভাবা।
তবে আপাতত, গালিবাফের পক্ষ থেকে কঠোর অস্বীকৃতি এবং মাঠ পর্যায়ে সামরিক সংঘাত অব্যাহত থাকায় এই ‘হট অপশন’ কেবল একটি কূটনৈতিক কৌশল নাকি বাস্তব সম্ভাবনা, তা সময়ই বলে দেবে।
(Feed Source: zeenews.com)
