জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিশ্বখ্যাত অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’ (Rich Dad Poor Dad) বইয়ের লেখক রবার্ট কিয়োসাকি আবারও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও সতর্কতামূলক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তাঁর মতে, ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্ব শেয়ার বাজারে একটি ভয়াবহ ধস নামতে চলেছে। কিয়োসাকি বরাবরই প্রথাগত বিনিয়োগ পদ্ধতির সমালোচক হিসেবে পরিচিত এবং এবারের সতর্কবার্তায় তিনি বিনিয়োগকারীদের সম্পদ রক্ষার জন্য বিকল্প পথের পরামর্শ দিয়েছেন।
২০২৬-এর আর্থিক সংকটের পূর্বাভাস
রবার্ট কিয়োসাকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি একটি ‘বাবল’ বা বুদবুদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কৃত্রিমভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণের ওপর ভিত্তি করে চলা এই অর্থনীতি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
তাঁর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সাল হবে সেই সময়, যখন শেয়ার বাজার ইতিহাসের অন্যতম বড় পতনের সাক্ষী থাকবে। এই ধস কেবল আমেরিকা নয়, বরং সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
কিয়োসাকির মতে, মার্কিন ডলারের ক্রমশ দুর্বল হওয়া এবং ফেডারেল রিজার্ভের ভুল নীতি এই সংকটের প্রধান কারণ। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষ যারা শুধুমাত্র সেভিংস অ্যাকাউন্ট বা মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর নির্ভরশীল, তারা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
‘তেল, রিয়েল এস্টেট এবং সোনাতে বিনিয়োগ করুন’
শেয়ার বাজারের প্রতি অনীহা প্রকাশ করলেও কিয়োসাকি নির্দিষ্ট কিছু খাতের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি তেল, রিয়েল এস্টেট, সোনা এবং রূপো ভালোবাসি।” তাঁর এই পছন্দের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে:
১. সোনা ও রূপো (Gold and Silver): কিয়োসাকি সোনা ও রূপোকে ‘ঈশ্বরের টাকা’ (God’s Money) বলে অভিহিত করেন। ইতিহাসের প্রতিটি আর্থিক সংকটে এই দুটি ধাতু নিজের মূল্য বজায় রেখেছে। যখন কাগজের মুদ্রার দাম কমে যায়, তখন সোনা ও রূপোর চাহিদা ও দাম দুই-ই বৃদ্ধি পায়।
২. তেল (Oil): বর্তমান বিশ্বের চালিকাশক্তি হল শক্তি বা এনার্জি। কিয়োসাকির মতে, তেলের চাহিদা কোনোদিন ফুরিয়ে যাবে না এবং এটি একটি বাস্তব সম্পদ (Hard Asset), যা মুদ্রাস্ফীতির সময় বিনিয়োগ রক্ষা করে।
৩. রিয়েল এস্টেট (Real Estate): জমি বা বাড়ির মালিকানা থাকা মানে একটি স্থায়ী সম্পদ থাকা। কিয়োসাকি মনে করেন, সঠিক সময়ে এবং সঠিক জায়গায় স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করলে তা সংকটের সময় নিয়মিত আয় (ভাড়ার মাধ্যমে) নিশ্চিত করতে পারে।
৪. বিটকয়েন (Bitcoin): প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিটকয়েনকে তিনি ‘জনগণের টাকা’ (People’s Money) বলে মনে করেন। ডিজিটাল এই সম্পদটি ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
কেন এই আসন্ন ধস?
কিয়োসাকির বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি হল মাত্রাতিরিক্ত ঋণ। বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো বর্তমানে ঋণের জালে জর্জরিত। যখন সুদের হার বৃদ্ধি পায় এবং ঋণের কিস্তি মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে, তখন শেয়ার বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এছাড়া, তিনি বারবার সতর্ক করেছেন যে, মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের পতনকে ত্বরান্বিত করবে।
বিনিয়োগকারীদের প্রতি পরামর্শ
রবার্ট কিয়োসাকি বিনিয়োগকারীদের ‘স্মার্ট’ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর প্রধান কয়েকটি টিপস হলো:
কাগুজে সম্পদে বিশ্বাস ত্যাগ: শুধুমাত্র স্টক বা বন্ডের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
আর্থিক শিক্ষা: বাজারের উত্থান-পতন বোঝার জন্য নিজেকে শিক্ষিত করে তোলা।
বিকল্প সঞ্চয়: ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখার চেয়ে সোনা বা রূপোর কয়েন কেনাকে তিনি বেশি লাভজনক মনে করেন।
রবার্ট কিয়োসাকির এই সতর্কবার্তা অনেক অর্থনীতিবিদের কাছে চরমপন্থী মনে হতে পারে, কিন্তু গত কয়েক বছরের বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা তাঁর কথাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না। ২০২৬ সালের সেই সম্ভাব্য ধস থেকে বাঁচতে হলে এখন থেকেই পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যময় করা এবং কিয়োসাকির ভাষায় ‘আসল সম্পদে’ বিনিয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। কিয়োসাকি মনে করেন, যারা সংকটের জন্য প্রস্তুত থাকে, তারাই শেষ পর্যন্ত লাভবান হয়।
(Feed Source: zeenews.com)
