জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: তেহরানের একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা ভাবুন। মাসের শুরুতে বাজার করতে গেলে এক কেজি চাল কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে প্রায় আমাদের হিসেবে প্রায় ৫০০ টাকা। ডালের দাম তিনগুণ। মাংস? সে তো এখন বিলাসিতার জিনিস। সাত কোটি ইরানির মধ্যে সত্তর লক্ষ মানুষ এই মুহূর্তে অভুক্ত। আর দেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনও ভাবে অপুষ্টিতে ভুগছেন।
এটা কোনও যুদ্ধের সিনেমার দৃশ্য নয়। এটাই আজকের ইরানের বাস্তবতা।
যুদ্ধের আগেই রান্নাঘরে আগুন
মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলা ইরানে শুরু হয় ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ইরানি রান্নাঘরে সংকট তার অনেক আগে থেকেই শুরু। বছরের পর বছর ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার ধস আর সরকারি অব্যবস্থাপনায় দেশটির অর্থনীতি ধুঁকছিল।
২০২৫ সালে সেপ্টেম্বর মাসেই ইরানে খুচরো খাদ্যমূল্যস্ফীতি বছরে ৪২ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের FAO। বিশেষজ্ঞদেরল একাংশ ওই সময় বলছিলেন, আসল সংখ্যাটা সরকারি পরিসংখ্যানের ঢের বেশি— ৫৮ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত।
এরপর ফেব্রুয়ারির হামলা। এবার খাদ্যমূল্যস্ফীতি পৌঁছে গেছে ১০৫ শতাংশে।চালের দাম: যা শুনলে চমকে উঠবেন
ইরানের নিজস্ব চাল উৎপাদন হয় উত্তরের গিলান প্রদেশে। তারম হাশেমি, শিরুদি, ফজর– এই জাতের চালগুলো ইরানিদের কাছে গৌরবের। কিন্তু ইরান ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট বলছে, এক বছর আগে যে চাল বিক্রি হত ১২ লক্ষ রিয়ালে (প্রায় ₹১০০/কেজি), সেটাই এখন ৩৫ লক্ষ থেকে ৪০ লক্ষ রিয়ালে উঠে গেছে। ভারতীয় মুদ্রায় হিসাব করলে দাঁড়ায় ₹২৬০–₹৩০০ প্রতি কেজি। আর ডিসেম্বর ২০২৫-এর তথ্য বলছে, এক কেজি চালের জন্য ইরানি বাজারে গুনতে হচ্ছে প্রায় ₹৪৭০-এর সমতুল। যুদ্ধ শুরুর পর সেটা আরও বেড়েছে।
গত বছর এই চালই কিনতাম ১২ লক্ষ রিয়ালে, তেহরানের বাসিন্দা ফরহাদ, ৩৮, বললেন ইরান ইন্টারন্যাশনালকে। এখন সাড়ে তিন লক্ষ। আর মালটাও আগের মতো ভালো না। রাজ্যের মহানগর বাজার সংস্থার হিসাবে যেখানে খুচরো বাজারের চেয়ে কম দামে বিক্রি হয়, সেখানেও এক কেজি তারম চালের দর ছাড়িয়ে গেছে ৩৩ লক্ষ রিয়াল।
ডাল, তেল, পেঁয়াজ: আগুন জ্বলছে
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের রিপোর্ট বলছে, ইরানে সবুজ মসুর ডাল আর ভোজ্যতেলের দাম তিনগুণ হয়ে গেছে। লেবুর দাম বেড়েছে ২৭২ শতাংশ মানে ভারতীয় মুদ্রায় ₹৩২০ প্রতি কেজি। রুটি ও দানাশস্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আর মাংস? মাংস এখন শুধু ধনীদের থালায়।
ভালো মাটন প্রতি কেজি ৩০০০ টাকার বেশি
বিফ ১৮০০ টাকা।
ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ শ্রমিক প্রতিনিধি মহসেন বাঘায়ি সতর্ক করেছিলেন, মাত্র দুই মাসে ভোজ্যতেল বেড়েছে ৪০ শতাংশ আর চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। তখনও যুদ্ধ শুরু হয়নি।
মুদ্রার পতন, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধস
এই দুর্ভোগের একটা বড় কারণ ইরানি রিয়ালের ভয়াবহ ধস। ২০১৫ সালে পরমাণু চুক্তির সময় ডলার ছিল মাত্র ৩২,০০০ রিয়াল। আজ খোলা বাজারে এক ডলার কিনতে লাগছে ১৫ লক্ষ থেকে ১৭ লক্ষ রিয়াল। অর্থাৎ দশ বছরে মুদ্রার মান হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ। এই মুদ্রার পতনই সরাসরি গিয়ে চাপছে আমদানি-নির্ভর খাদ্যপণ্যের দামে। ইরানের মোট আমদানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশই কৃষিপণ্য।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নোট ছেপেছে। ১ কোটি রিয়ালের নোট। এটাই বলে দেয় পরিস্থিতি কোথায় গিয়েছে।
রাস্তায় বিক্ষোভ, ইন্টারনেট বন্ধ, অর্থনীতি মরতে বসেছে
২০২৫-এর শেষ থেকে ২০২৬-এর শুরু পর্যন্ত ইরানের ৩১টি প্রদেশেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। এটাকে ২০২২ সালের মাহসা আমিনি আন্দোলনের পর দেশের সবচেয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ বলে মনে করা হচ্ছে। বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন বাজারের দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা — যাঁরা দেখছিলেন তাঁদের জীবিকা ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে দমনপীড়নে নামে।
বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে ২০২৫ ও ২০২৬— দু’বছরই ইরানের অর্থনীতি সংকুচিত হবে। বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬০ শতাংশের দিকে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ, বিশ্ব বাজারেও ঢেউ
ইরানের এই সংকট এখন শুধু তেহরানের সমস্যা নয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সার রফতানি হয়। যুদ্ধ শুরুর পর সেই পথ কার্যত বন্ধ। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা সংস্থা IFPRI জানাচ্ছে, ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচল প্রায় থেমে গেছে। ইউরিয়া সারের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে।
ভারতও এর বাইরে নয়। ভারত তার ৪০ শতাংশেরও বেশি ইউরিয়া ও ফসফেট সার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে।
কাতারের LNG সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভারতের তিনটি ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন কমাতে হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম চাল রফতানিকারী দেশ হিসেবে ভারতের কৃষি উৎপাদনেও এর চাপ পড়তে পারে আগামী মরসুমে।
যুদ্ধ মানেই রান্নাঘরে আঁধার
তেহরানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মিত্রা (৫১) বলেছেন, আমি গিলানে বড় হয়েছি, যেখানে ভাত ছিল জীবনের সবচেয়ে পবিত্র জিনিস। সেই চাল এখন তাঁদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
যুদ্ধ কেবল মানচিত্র বদলায় না। যুদ্ধ প্রথমে রান্নাঘরে ঢোকে। তারপর থালায়। তারপর মানুষের মুখ থেকে গ্রাস কেড়ে নেয়। ইরান আজ সেই বাস্তবতার সাক্ষী।
তথ্যসূত্র: Iran International, IFPRI, Council on Foreign Relations, PBS NewsHour, Wikipedia (Iranian Economic Crisis), House of Commons Library, Food and Agriculture Organization (FAO), World Bank
(Feed Source: zeenews.com)
