)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিশ্বের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংগঠনটি ঘোষণা করেছে যে, এখন থেকে দেশের সকল দোকান, বাণিজ্য বিতান ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।
সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয় প্রচেষ্টাকে করতে সুদৃঢ় করতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই ‘আংশিক বিধিনিষেধ’ বা স্বেচ্ছায় লকডাউন সদৃশ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি অনেক উন্নয়নশীল দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশও এই বিশ্ব সংকটের বাইরে নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তাতে সংহতি প্রকাশ করতেই ব্যবসায়ীরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
বাংলাদেশের দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি ও ঢাকার দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির স্ট্যান্ডিং কমিটির এক যৌথ সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
বিজ্ঞপ্তির মূল বিষয়
সংগঠনটির পক্ষ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে:
সময়সীমা: ঢাকা শহর-সহ সারা দেশের সকল ছোট-বড় দোকান, বাণিজ্য বিতান ও আধুনিক শপিংমলগুলো প্রতিদিন রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।
জরুরি সেবা: জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে বেশ কিছু খাতকে এই নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে:
১. ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান।
২. হোটেল ও রেস্তোরাঁ (কেবল খাদ্য সরবরাহ ও পার্সেলের জন্য নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী)।
৩. কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান।
৪. অন্যান্য জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
কেন এই ‘আংশিক লকডাউন’?
সাধারণত বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় শপিংমল ও আলোকসজ্জার কাজে। এই পিক-আওয়ারে বিদ্যুতের লোড কমাতে পারলে আবাসিক এলাকা এবং কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যে টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে এখনই সাশ্রয়ী না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই একে একটি ‘জাতীয় দায়িত্ব’ হিসেবে দেখছেন তারা।
জনজীবনে প্রভাব
রাত্রিবেলায় শপিংমল বন্ধ রাখার এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে।
ইতিবাচক প্রভাব চ্যালেঞ্জ
বিদ্যুৎ সাশ্রয়: পিক আওয়ারে লোড শেডিংয়ের ঝুঁকি কমবে।
ব্যবসায়িক ক্ষতি: বিশেষ করে ঈদ বা উৎসবের আগে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা।
পারিবারিক সময়: দোকান মালিক ও কর্মচারীরা পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারবেন।
শ্রমিকদের আয়: ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে যাওয়া।
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ: রাতে আগেভাগে দোকান বন্ধ হলে যানজট কিছুটা কমতে পারে।
ক্রেতাদের অভ্যাস: রাতে কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত নাগরিকদের জন্য সাময়িক অসুবিধা।
সরকারি পদক্ষেপ
যদিও এই সিদ্ধান্তটি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে, তবে এর সঠিক বাস্তবায়নে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার ইতিপূর্বেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারি করেছিল, তবে মালিক সমিতির এই সরাসরি অংশগ্রহণ সেই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে কেবল দোকান বন্ধ নয়, বরং অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার মতো কঠোর পদক্ষেপও প্রয়োজন হতে পারে।
‘বিদ্যুৎ সাশ্রয় মানেই অর্থের সাশ্রয় এবং দেশের সুরক্ষা’—এই স্লোগানকে সামনে রেখেই বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করার এই সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে সাধারণ মানুষের কেনাকাটায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটালেও, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
দেশের এই কঠিন সময়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচি সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে তুলনামূলক কম পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। সকল দোকান মালিক ও সাধারণ ক্রেতাদের এই নিয়ম মেনে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
(Feed Source: zeenews.com)
