)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: প্রকৃতির এক ভয়াবহ রূপ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ ইন্দোনেশিয়ায়। বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে পশ্চিম সুমাত্রা উপকূলে ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প। কম্পনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে সুমাত্রা দ্বীপের বিশাল এলাকা জুড়ে সুনামির সতর্কতা জারি করা হয়। সাগরের তলদেশে সৃষ্ট এই কম্পন কেবল ইন্দোনেশিয়া নয়, বরং ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোর মধ্যেও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ও তীব্রতা
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) শুরুতে এই ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে ৮.২ বলে ঘোষণা করেছিল। তবে তথ্য বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের পর পরবর্তীতে তা সংশোধন করে ৭.৮ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে, একই দিনে মোলুক্কা সাগরের তার্নেট দ্বীপের কাছে ৭.৪ মাত্রার আরও একটি কম্পন অনুভূত হয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
সুমাত্রার এই মূল ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল পশ্চিম সুমাত্রার প্রধান শহর পাডাং থেকে প্রায় ৮০৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, সমুদ্রের ২৪ কিলোমিটার গভীরে। প্রাথমিকভাবে একে ‘অগভীর ভূমিকম্প’ হিসেবে চিহ্নিত করায় সুনামির প্রবল আশঙ্কা দেখা দেয়। ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, অগভীর কম্পন সমুদ্রের জলরাশিকে দ্রুত ও সজোরে আন্দোলিত করতে পারে, যা সুনামির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সুনামি সতর্কতা
ভূমিকম্পের তীব্রতা অনুভূত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতি বিষয়ক সংস্থা (BMKG) পশ্চিম সুমাত্রা, উত্তর সুমাত্রা এবং আচেহ প্রদেশের জন্য ‘রেড অ্যালার্ট’ বা চূড়ান্ত সুনামি সতর্কতা জারি করে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকেও জানানো হয়, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের ১০০০ কিলোমিটার বা ৬২১ মাইলের মধ্যে সুনামির মতো উঁচু জলোচ্ছ্বাস দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সতর্কবার্তার পরেই সুমাত্রা দ্বীপের উপকূলীয় অঞ্চলে হাহাকার পড়ে যায়। ২০০৪ সালের প্রলয়ঙ্কারী সুনামিতে আচেহ প্রদেশ যেভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল, সেই দুঃসহ স্মৃতি মানুষের মনে দগদগে। সাইরেনের শব্দে আতঙ্কিত হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু জায়গার খোঁজে পালাতে শুরু করে। পাডাং শহরের রাস্তায় সৃষ্টি হয় অসহনীয় যানজট। মোটরসাইকেল, গাড়ি ও পায়ে হেঁটে মানুষের এই প্রাণান্তকর ছোটাছুটি এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির অবতারণা করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আতঙ্কিত মানুষের চিৎকারে পুরো আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব
ইন্দোনেশিয়ার এই কম্পন আন্তর্জাতিকভাবেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রেলিয়া তাদের পশ্চিম উপকূলে আংশিক সুনামি সতর্কতা জারি করে। ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় কম্পন অনুভূত হওয়ায় ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোও তাদের উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে প্রতিটি মুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল যাতে কোনো সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলা করা যায়।
ক্ষয়ক্ষতি
ভূমিকম্পটি অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও একটি স্বস্তির বিষয় ছিল যে, এর কেন্দ্রস্থলটি স্থলভাগ থেকে অনেক দূরে সাগরের গভীরে ছিল। জাকার্তার জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থা জানায়, পাডাং বা তার আশেপাশের প্রধান শহরগুলোতে কোনো বড় ভবন ধসে পড়ার বা প্রাণহানির খবর তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে মেন্টাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মতো দুর্গম দ্বীপগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেখানকার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করতে উদ্ধারকর্মীদের বেশ বেগ পেতে হয়। সমুদ্র উপকূলীয় নিচু এলাকাগুলোতে কম্পনের ফলে কিছু কাঁচা ঘরবাড়িতে ফাটল ধরার খবর পাওয়া গেছে।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
টানা তিন ঘণ্টার চরম উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার পর, যখন দেখা যায় সমুদ্রের পানির স্তরে অস্বাভাবিক কোনো উচ্চতা বৃদ্ধি বা পরিবর্তন আসেনি, তখন রাত ১০টার দিকে সুনামির সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ভূতত্ত্ববিদরা বিশ্লেষণ করে জানান, ভূমিকম্পটি ছিল ‘স্ট্রাইক-স্লিপ’ প্রকৃতির। এই ধরনের কম্পনে ভূ-ত্বকের পাতগুলো পাশাপাশি ঘর্ষণের ফলে সরে যায়, যা সমুদ্রতলের গঠনকে উলম্বভাবে ধাক্কা দেয় না। ফলে বড় ধরনের কোনো জলোচ্ছ্বাস বা ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়নি। সতর্কতা তুলে নেওয়ার পর মানুষ ধীরে ধীরে ঘরে ফিরতে শুরু করলেও, মাঝরাত পর্যন্ত মৃদু কম্পন বা ‘আফটারশক’-এর ভয়ে অনেকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান।
বর্তমান পরিস্থিতি
ইন্দোনেশিয়া ভৌগোলিকভাবে ‘প্যাসিফিক রিং অফ ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত, যা একে পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত করেছে। বুধবারের এই ঘটনা দেশটিকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষ কতটা অসহায়। যদিও এবারের দুর্যোগে বড় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি, তবুও এটি ইন্দোনেশীয় প্রশাসনের দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতাকে আরও একবার কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সুনামি আতঙ্ক কেটে গেলেও পরবর্তী কয়েকদিন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তারা বিশেষ দল গঠন করেছে। প্রকৃতির এই আকস্মিক আঘাত মোকাবিলায় সুনামির আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের সচেতনতা ভবিষ্যতে বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
(Feed Source: zeenews.com)
