
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বরফ গলার কোনও লক্ষণ তো নেই-ই, বরং দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাগযুদ্ধ এখন চরম পর্যায়ে। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে, প্রয়োজন পড়লে পাকিস্তান ভারতের ভিতরে ঢুকে হামলা করবে।
তাঁর এই মন্তব্য সরাসরি ভারতের সেই নীতির পক্ষেই কথা বলছে, যেখানে ভারত বারবার বলে এসেছে যে—সন্ত্রাসবাদীদের নির্মূল করতে ভারত প্রয়োজনে সীমান্ত পেরিয়ে শত্রুশিবিরে আঘাত হানতে (Targeted Killings) প্রস্তুত।
খাজা আসিফের মন্তব্যের নেপথ্যে কী?
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে দাবি করা হয় যে ২০২০ সাল থেকে ভারত, পাকিস্তানের মাটিতে ২০ জন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে খতম করেছে।
ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় এবং সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, ভারত এখন আর কেবল রক্ষণাত্মক নয়, বরং ‘ঘরে ঢুকে মারবে’ (Ghar Mein Ghus Kar Maarenge)— অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ দমনে ভারত কোনও আন্তর্জাতিক সীমানার তোয়াক্কা করবে না।
এই বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিতে গিয়েই খাজা আসিফ বলেন, ‘ভারত যদি মনে করে তারা আমাদের মাটিতে এসে কাউকে মারবে এবং আমরা চুপ করে থাকব, তবে তারা ভুল ভাবছে। আমরাও ভারতের ভেতরে ঢুকে পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা রাখি।’ তিনি আরও দাবি করেন যে, ভারত মূলত নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ধরণের ‘উগ্র জাতীয়তাবাদী’ মন্তব্য করছে।
ভারতের কড়া অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া
ভারতের পক্ষ থেকে খাজা আসিফের এই মন্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া না হলেও, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা একে ‘ভিত্তিহীন আস্ফালন’ বলে অভিহিত করেছেন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার প্রমাণ করেছে যে, পাকিস্তান এখনও লস্কর-ই-তৈবা এবং জইশ-ই-মহম্মদের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে চলেছে।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গত মাসেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান যদি তাদের মাটি থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধ না করে, তবে ভারত উপযুক্ত জবাব দিতে জানে। কেউ যদি পালিয়ে পাকিস্তানে যায়, তবে তাকে সেখানেই গিয়ে মারা হবে।’
খাজা আসিফ মূলত ভারতের এই কঠোর অবস্থানের মুখে নিজেদের দেশের জনতাকে আশ্বস্ত করতে এই ধরণের ‘বিপজ্জনক’ মন্তব্য করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের ক্ষমতা কী?
বর্তমানে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। চরম মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে টান এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় পাকিস্তান কার্যত খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের মতো একটি সামরিক মহাশক্তির সাথে সরাসরি সংঘাতের হুমকি দেওয়াকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ‘হাস্যকর’ বলে মনে করছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের বালাকোট এয়ারস্ট্রাইকের পর ভারত দেখিয়ে দিয়েছিল যে তারা পাকিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে জঙ্গি ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে। অন্যদিকে, পাকিস্তান বর্তমানে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তানে টিটিপি (তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান) এবং বিএলএ-র মতো গোষ্ঠীগুলোর মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। খোদ পাকিস্তানের মাটিতেই যখন নিরাপত্তা সুনিশ্চিত নয়, তখন ভারতের মতো সুসজ্জিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দেশে ঢুকে হামলা চালানো যে তাঁদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।
ভারতের নিরাপত্তা সতর্কতা
পাকিস্তানের এই ধরণের বারংবার প্ররোচনামূলক মন্তব্যের জেরে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ-সহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে অনুপ্রবেশ রুখতে বিএসএফ (BSF) অত্যন্ত সতর্ক। গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, নির্বাচনের আবহে ভারতের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি করতে সীমান্ত দিয়ে নাশকতামূলক ষড়যন্ত্র চালানো হতে পারে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্য কেবল আস্ফালন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য একটি অশনি সংকেত। আন্তর্জাতিক মহলে একঘরে হয়ে পড়া পাকিস্তান এখন ‘জাতীয়তাবাদ’-এর তাস খেলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে চাইছে। তবে ভারতের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং শক্তিশালী সীমান্ত পাহারা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অতীতের মতো আর কোনো প্ররোচনা সহ্য করা হবে না।
খাজা আসিফের ‘ভারতে ঢুকে মারার’ এই হুমকি শেষ পর্যন্ত নিছকই রাজনৈতিক বুলি হয়ে থাকবে না কি এর পেছনে কোনও গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে, তা নিয়ে সজাগ রয়েছে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী। আপাতত এই বাগযুদ্ধ কতদূর গড়ায়, সেদিকেই নজর বিশ্ব কূটনীতির।
(Feed Source: zeenews.com)
