
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গে এখন আক্ষরিক অর্থেই কমিশন-রাজ। আর সেই আবহেই পটনায় একটি অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন বললেন এমন কথা, যা এই মুহূর্তে কাকতালীয় মনে হলেও আসলে ভয়ংকর প্রাসঙ্গিক। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন যদি রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করে,তা হলে গণতন্ত্রের ভিতটাই নড়ে যায়।
উল্লেখ্য, তাঁর এই কথাটা বলার দিনেই ভোট-বাংলায় ভোটার তালিকা নিয়ে টানাটানি চলছে। প্রশ্ন উঠছে স্বচ্ছতা নিয়ে। মামলা চলছে সুপ্রিম কোর্টে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মালদহ থেকে একের পর এক সমালোচনার বাণে বিদ্ধ করেছেন নির্বাচন কমিশনকে।
যেখান থেকে বিতর্কের শুরু
এ বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া চালায় নির্বাচন কমিশন। তাতে চমকে যাওয়ার মতো পরিসংখ্যান সামনে আসে।
খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েন প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটার। চূড়ান্ত তালিকায় প্রায় ৬০ লক্ষ নাম রইল ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থায়। অর্থাৎ তাঁরা ভোটার কি না, সেটাই স্থির হয়নি। নির্বাচনের দামামা বাজছে, আর এই বিশালসংখ্যক মানুষ জানেন না তাঁরা ভোট দিতে পারবেন কি না।
সুপ্রিম কোর্টকে নামতে হল
বিষয়টি এতটাই জটিল আকার নিল যে সুপ্রিম কোর্ট নিজে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হল। আদালতের নির্দেশে প্রায় ৭০০ বিচারবিভাগীয় আধিকারিক নিযুক্ত হলেন। বাংলার আধিকারিকের সংখ্যা পর্যাপ্ত না হওয়ায় ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং ওড়িশা থেকেও বিচারকদের আনতে হল। পুরো ব্যবস্থার তদারকিতে থাকলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি।
এমন নজির ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল।
শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি মন্তব্য করে, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া বাকি কোনও রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে এভাবে আদালতে মামলা আসেনি। এই একটি পর্যবেক্ষণই অনেক কিছু বলে দেয়।
অভিযোগ, পালটা অভিযোগ
তৃণমূলের তরফে অভিযোগ, সংখ্যালঘু ও মহিলাদের নাম ইচ্ছাকৃত ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি কমিশন দফতরে গিয়ে দাবি করেছেন, বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে বেআইনিভাবে নাম ঢোকানো হচ্ছে।
অন্যদিকে কমিশন জানিয়েছে, নিষ্পত্তির কাজ দ্রুত চলছে। চূড়ান্ত তালিকায় প্রায় ১৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। বাকি ৪০ লক্ষের নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে কতজন বাদ পড়েছেন, সেই তথ্য প্রতিবারই অস্পষ্ট থেকে গিয়েছে।
স্বচ্ছতার এই অভাবটাই বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই পটভূমিতে বিচারপতির কথা
এই যে পরিস্থিতি, ঠিক এই পরিস্থিতিতে বিচারপতি নাগরত্ন যা বললেন, সেই কথাগুলো নতুন মাত্রা পায়।
তাঁর বক্তব্য, একটি দেশ ঠিক ততটাই স্বাধীন, যতটা স্বাধীন তার প্রতিষ্ঠানগুলো। নির্বাচন কমিশন, ক্যাগ বা অর্থ কমিশনের উপর বাইরের প্রভাব যত কম, গণতন্ত্র তত সুস্থ। তিনি আরও বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংবিধানিক কাঠামো তৈরিই হয়েছে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি তিনি বললেন সেটি হল– যে সংস্থা ভোট পরিচালনা করে, সেই সংস্থা যদি ভোটে অংশগ্রহণকারীদের উপর কোনও ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সরাসরি কারও নাম না করেও তিনি অনেক কিছু বললেন। এবং ঠারেঠোরে বর্তমানে নির্বাচন কমিশন যে ভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেই দিকেই ইঙ্গিত করেছেন তিনি।
ভোট মানে শুধু একটি ছুটির দিন নয়
বিচারপতি নাগরত্নের মতে, নির্বাচন নিছক একটি সাময়িক মুহূর্ত নয়, একটি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই শান্তিপূর্ণ ভাবে ক্ষমতার হাতবদল হয়। সেই ব্যবস্থা যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে ফলাফল যাই হোক, জনমানসে একটা অবিশ্বাস থেকে যায়।
এবার বাংলার ভোটার তালিকা বিতর্ক সেই অবিশ্বাসের বীজ বুনে দিয়েছে কি না, সেটা সময় বলবে।
উল্লেখ্য, বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন ২০২৭ সালেই ভারতের প্রধান বিচারপতি হওয়ার দাবিদার। সেক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসে তিনিই হবেন সুপ্রিম কোর্টের প্রথম মহিলা প্রধান বিচারপতি। তাই তাঁর প্রতিটি মন্তব্যই এখন বিশেষ তাত্পর্যের। নজরকাড়া এবং উল্লেখযোগ্য।
(Feed Source: zeenews.com)
