
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: রাত ১২টায় ঘুমোতে গেলেন, ভোর পাঁচটায় উঠে পড়লেন। মাত্র পাঁচ ঘণ্টা। মনে হচ্ছে চলে যাচ্ছে। কিন্তু আসলে চলছে না। অ্যামেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ গবেষণা বলছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি রাতে কম করে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম দরকার। এর কম হলে শুধু ক্লান্তি নয়, শরীরের ভেতরে শুরু হয় গভীর ক্ষতি।
হার্ট অ্যাটাক থেকে শুরু করে অকালমৃত্যু
ঘুম কম হলে কী হয়? গবেষণা বলছে, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। সেই সঙ্গে বাড়ে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ওবেসিটি, ডিপ্রেশন, এমনকি ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের আশঙ্কাও। অকালমৃত্যুর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এতটাই গুরুতর বিষয় যে অ্যামেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ২০২২ সালে তাদের ‘লাইফস এসেনশিয়াল ৮’ তালিকায় ঘুমকে আলাদাভাবে যোগ করেছে। হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার যে আটটি অপরিহার্য শর্ত আছে, ঘুম এখন তার একটি।ঘুমের মধ্যে শরীর কী করে? এই প্রশ্নটাই আসল চাবিকাঠি। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অফ মেডিসিনের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও স্লিপ অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ প্রোগ্রামের ডিরেক্টর ডা. মাইকেল গ্র্যান্ডনার বলছেন, ‘ঘুমের মধ্যে শরীরে অনেক কিছু ঘটে। পর্যাপ্ত সময় না পেলে এই কাজগুলো ঠিকঠাক হয় না।’ ডা. গ্র্যান্ডনার নিজেই ২০২২ সালে সেই অ্যাডভাইজরি রিপোর্ট সহলেখক ছিলেন, যেটি ঘুমকে ‘লাইফস এসেনশিয়াল ৮’-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে।
ঘুম মূলত তিন ভাগে কাজ করে।
প্রথম ভাগ: গভীর ঘুম
রাতের প্রথম কয়েক ঘণ্টা সবচেয়ে গভীর ঘুম হয়। এই সময় শরীর ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু সারিয়ে তোলে। আর মস্তিষ্ক তার ‘আবর্জনা’ পরিষ্কার করে। নিউরনের মাঝের ফাঁকা জায়গাটা একটু বাড়ে, যাতে দিনভর জমা বর্জ্য বেরিয়ে যেতে পারে। ডা. গ্র্যান্ডনার এই প্রক্রিয়াকে বলছেন ‘সিন্যাপটিক প্রুনিং’, মস্তিষ্ক ঠিক করে নেয় কোন স্মৃতি রাখতে হবে, কোনটা ফেলে দিতে হবে।
দ্বিতীয় ভাগ: REM ঘুম
গভীর ঘুমের পর আসে রেম (REM) স্লিপ। এই পর্যায়ে মস্তিষ্ক সক্রিয়, কিন্তু শরীর নড়াচড়া করে না। স্বপ্ন দেখা হয় এই সময়েই। শেখা, স্মৃতি, মেজাজ, সব কিছু নিয়ন্ত্রণ হয় এই পর্যায়ে।
ডা. গ্র্যান্ডনার বলছেন, ‘রাত কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রেম ঘুমের সময়টা বাড়তে থাকে। কিন্তু কেউ যদি কম ঘুমান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রেম ঘুমটাই বঞ্চিত হয়।’ ফলে স্মৃতিশক্তি কমে, মেজাজ বিগড়ে যায়, মনোযোগ থাকে না।
তৃতীয় ভাগ: শেষ রাতের ঘুম
এটি হয়তো সবচেয়ে অবহেলিত অংশ। রাতের শেষ পর্যায়ে মানসিক পুনরুদ্ধার হয়, শরীরের শারীরিক মেরামতও সম্পন্ন হয় এই সময়।
ডা. গ্র্যান্ডনার একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলছেন, ঘুম অনেকটা ড্রাইভওয়ে পরিষ্কার করার মতো। প্রথম পর্যায়ে হাই প্রেশার জল দিয়ে ময়লা ধুয়ে ফেলা হয়। আর শেষ পর্যায়ে সেই ড্রাইভওয়েতে নতুন করে সিল করা হয়। শেষ পর্যায়ের আগেই যদি উঠে পড়েন, মেরামতটাই অসম্পূর্ণ থাকে।
শিশুদের আরও বেশি ঘুম চাই
অ্যামেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সুপারিশ অনুযায়ী, পাঁচ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের প্রতিদিন ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা ঘুম দরকার। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা, আর কিশোরদের জন্য ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা।
কারণটা সহজ। ঘুমের সময়ই শরীরে গ্রোথ হরমোন নিঃসৃত হয়।
ভালো ঘুমের জন্য কী করবেন?
এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোলিন্স স্কুল অফ পাবলিক হেলথের সহকারী অধ্যাপক ও স্লিপ এপিডেমিওলজিস্ট ডা. ডায়না জনসন কিছু সহজ পরামর্শ দিয়েছেন। প্রতি রাতে একই সময়ে ঘুমোতে যাওয়ার অভ্যাস করুন। ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখুন। ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক হওয়া জরুরি। আর ঘুমের আগে মোবাইল, টেলিভিশন বা ল্যাপটপ বন্ধ রাখুন। ডা. জনসন জানাচ্ছেন, ঘুমের পরিবেশ তৈরি করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনজনে একজন কম ঘুমাচ্ছেন
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন পর্যাপ্ত ঘুম পান না। অথচ এই ছোট্ট অভ্যাসটাই পারে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে দিতে। আজ রাত থেকেই ভাবুন। অ্যামেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, সুস্থ জীবনের আটটি স্তম্ভের একটি হল পর্যাপ্ত ঘুম। বাকিগুলো মেনে চললেও এটা এড়িয়ে গেলে লাভ নেই।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদন শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনও চিকিৎসা পরামর্শ নয়। যে কোনও স্বাস্থ্য সমস্যায় অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
(Feed Source: zeenews.com)
