
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাস। অ্যাপোলো ১৩-র (Apollo 13) অক্সিজেন ট্যাংক বিস্ফোরিত হয়ে গিয়েছিল মহাকাশের বুকে। চাঁদে নামার স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। কিন্তু সেই বিপর্যস্ত যাত্রাতেই তিন নভোচারী পৌঁছে গিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে ৪ লক্ষ ১৭১ কিলোমিটার দূরে। সেটাই ছিল মানবজাতির সর্বোচ্চ দূরত্বের রেকর্ড। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অটুট।
সেই রেকর্ড আজ ভাঙল।
নাসার আর্টেমিস টু মিশনের চার নভোচারী, কমান্ডার রেড ওয়াইজম্যান (Reid Wiseman), পাইলট ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover), মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কক (Christina Koch) এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন (Jeremy Hansen), আজ চাঁদকে পাশ কাটিয়ে পৌঁছে গেলেন ৪ লক্ষ ৬ হাজার ৭৭৩ কিলোমিটার দূরে। পুরনো রেকর্ড ভাঙল প্রায় ৬ হাজার ৬০০ কিলোমিটার ব্যবধানে।
এটা শুধু একটা সংখ্যা নয়। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭-র (Apollo 17) পর এই প্রথম মানুষ পৌঁছাল পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে।
ছয় ঘণ্টার সেই যাত্রা
গত ১ এপ্রিল ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার (Kennedy Space Center) থেকে উড়ে গিয়েছিল আর্টেমিস টু। আজ, পঞ্চম দিনে, এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
ছয় ঘণ্টা ধরে চলল চাঁদের চারদিকে ফ্লাইওভার। ওরিয়ন (Orion) ক্যাপসুল চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার দূরত্বে চক্কর দিয়ে একটা বিশাল মহাকাশীয় ‘ইউ-টার্ন’ নিয়ে ফেরার পথ ধরল। এই পথকে বলা হয় ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’ (free-return trajectory), মানে পৃথিবী আর চাঁদের মাধ্যাকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি বাঁচিয়ে ফিরে আসার কৌশল। অনেকটা মহাজাগতিক আট-এর মতো পথ। মহাজাগতিক আট বলতে এখানে সৌরজগতের ৮টি গ্রহ বোঝানো হচ্ছে। বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন। প্লুটো এখন আর গ্রহ হিসেবে গণ্য হয় না, তাই ৮ গ্রহই ‘cosmic eight’ হিসেবে ধরা হয়।
এই একই রুট ব্যবহার করেছিল অ্যাপোলো ১৩। তবে সেবার ছিল বিপদ থেকে বাঁচার শেষ উপায়। এবার এটাই পরিকল্পিত রুট।
চাঁদের পিছন দিকে যাওয়ার সময় প্রায় ৪০ মিনিট পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় নভোচারীদের। সেই নীরবতার মধ্যেই তাঁরা দেখলেন চাঁদের সেই অংশ, যা আগে কোনো মানুষের চোখ এত কাছ থেকে দেখেনি।
যাঁরা গেলেন, যা ইতিহাস
এই মিশনে ইতিহাস একসঙ্গে কয়েকটা। ভিক্টর গ্লোভার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী যিনি চাঁদের এত কাছে গেলেন। ক্রিস্টিনা কক প্রথম মহিলা। জেরেমি হ্যানসেন প্রথম আমেরিকা-বহির্ভূত নাগরিক যিনি চাঁদকে এভাবে দেখলেন।
গ্লোভার জানিয়েছেন, পৃথিবীকে মহাশূন্য থেকে দেখলে মনে হয় ‘অনন্ত শূন্যতার মাঝে একটা মরূদ্যান।’ তাঁর কথায়, এই যাত্রা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, মানুষ আসলে এক। বিভেদ নয়, পৃথিবীটাকে একসঙ্গে আঁকড়ে ধরাই আসল কাজ।
ক্রিস্টিনা কক বলেছেন, চাঁদ এমন একটা জিনিস যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ বোঝে, অনুভব করে। এই যাত্রা তাই শুধু চার নভোচারীর নয়, গোটা মানবজাতির।
আরও পড়ুন- Sunita Williams: নাসা-র ভুলে মৃত্যুমুখে ৯ মাস কাটিয়ে সুনীতা হাতে …
Sweet dreams, @NASAArtemis II crew.
One last look at the Moon before flight day six and your epic lunar flyby, taking you farther into space than humans have EVER traveled. pic.twitter.com/roqklB0iGQ
— NASA (@NASA) April 6, 2026
এরপর কী?
শুক্রবার প্রশান্ত মহাসাগরে স্প্ল্যাশডাউন হবে ওরিয়নের। তারপর থেকেই শুরু হবে পরের ধাপের প্রস্তুতি। ২০২৭ সালে আর্টেমিস থ্রি (Artemis III) মিশনে চাঁদের কক্ষপথে ল্যান্ডারের সঙ্গে ডকিং মহড়া। আর ২০২৮ সালে আর্টেমিস ফোর (Artemis IV)-এ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষের পা পড়বে প্রথমবার।
৫৪ বছর পর মানুষ আবার স্বপ্ন দেখছে। এবার শুধু দেখা নয়, থাকার স্বপ্ন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্য নাসা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ আপডেটের ভিত্তিতে তৈরি। মহাকাশ বিজ্ঞান সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের জন্য নাসার অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (nasa.gov) দেখুন।
(Feed Source: zeenews.com)
