
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-আমেরিকা সংঘাতের আঁচে এবার বাংলাদেশে আংশিক লকডাউন। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার রবিবার থেকে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক এবং বাজারের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। সরকারের এই কঠোর অবস্থান বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সহায়ক হলেও উৎসবের মুখে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
অফিস ও ব্যাংকিং
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী:
সরকারি ও বেসরকারি অফিস: আগের সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার পরিবর্তে এখন কাজ চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। অর্থাৎ দৈনিক কাজের সময় এক ঘণ্টা কমানো হয়েছে।
ব্যাংকিং পরিষেবা: ব্যাংকগুলো সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও গ্রাহকদের লেনদেনের সময়সীমা কমিয়ে দুপুর ৩টা পর্যন্ত করা হয়েছে।
বাজার ও শপিং মল: ব্যবসায়ীদের অনুরোধে সময় কিছুটা শিথিল করে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কেনাকাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে হাসপাতাল, গণমাধ্যম, দমকল, বন্দর এবং ইন্টারনেটের মতো জরুরি পরিষেবাগুলো এই বিধিনিষেধের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
অন্ধকারে মাল্টিপ্লেক্স
সরকারের এই নির্দেশনার ফলে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের মাল্টিপ্লেক্স ও সিনেমা হলগুলো। সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিপণি বিতান বন্ধ করার বাধ্যবাধকতায় বন্ধ হয়ে গেছে সিনেমা হলের ‘প্রাইম টাইম’ বা সন্ধ্যা ও রাতের শোগুলো। এবারের ঈদের বিগ বাজেট সিনেমাগুলোর নির্মাতা ও প্রযোজকেরা এই বিষয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে তাঁদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিবৃতিতে সই করেছেন—
‘দম’ সিনেমার প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল ও পরিচালক রেদওয়ান রনি।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর নির্মাতা তানিম নূর।
‘প্রেশার কুকার’-এর পরিচালক রায়হান রাফী।
‘রাক্ষস’-এর প্রযোজক শাহরিন আক্তার সুমি এবং ‘প্রিন্স’-এর প্রযোজক শিরিন সুলতানা।
‘প্রাইম টাইম’ হারানোয় কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা
যৌথ বিবৃতিতে নির্মাতারা জানিয়েছেন, তাঁরা সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় নীতিকে সমর্থন করলেও সন্ধ্যা ৭টায় হল বন্ধ করে দেওয়া চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য ‘মৃত্যুঘণ্টা’ হতে পারে। তাঁদের মতে, ঈদের সিনেমার মূল প্রাণ হলো সন্ধ্যা ও রাতের শো। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে পরিবার নিয়ে দর্শক সাধারণত এই সময়েই প্রেক্ষাগৃহে আসেন।
নির্মাতা ও প্রযোজকদের দাবি, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শো বন্ধ হয়ে গেলে বিপুল সংখ্যক দর্শক সিনেমা দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন, যা কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে বাংলাদেশের সিনেমা যখন ফের ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, তখন এই সিদ্ধান্ত শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
কেন এই কঠোর পদক্ষেপ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্বের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নেমেছে।
বাংলাদেশ মূলত আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সচল রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। সরকার মনে করছে, এখনই যদি কৃচ্ছ্রসাধন না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ব্ল্যাকআউটের মুখে পড়তে হতে পারে দেশ।
জনজীবনে প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
অফিসের সময় কমে যাওয়ায় ট্রাফিক জ্যামের ধরণ বদলেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক কাজ করছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধ করার ফলে ঈদের বেচাকেনায় বড়সড় প্রভাব পড়ছে।
বিশেষ করে যারা অফিস শেষ করে কেনাকাটা করতে আসতেন, তাঁরা আর সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, সিনেমা প্রেমীদের বক্তব্য— বিনোদনের একমাত্র মাধ্যমটি যদি সন্ধ্যার পর বন্ধ হয়ে যায়, তবে উৎসবের আমেজ ফিকে হয়ে পড়বে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের এই ‘আংশিক লকডাউন’ সদর্থক হলেও এর বহুমুখী অর্থনৈতিক প্রভাব অনস্বীকার্য। বিশেষ করে ধুঁকতে থাকা চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে সিনেমা হলের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও ছাড় বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে এখন সরব সিনেমা পাড়া।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই এই বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে। তবে আপাতত, উৎসবের মরসুমে সন্ধ্যার অন্ধকারই যেন বাংলাদেশের বিনোদন জগতের ললাট লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
(Feed Source: zeenews.com)
