রাজীব চক্রবর্তী: ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। এবার তা নজিরবিহীন সাংবিধানিক সংঘাতের রূপ নিল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আনা বিরোধীদের ইমপিচমেন্ট বা অপসারণের নোটিস সোমবার খারিজ করে দিয়েছেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি.পি. রাধাকৃষ্ণণ।
গত ১২ মার্চ এই নোটিশ জমা দেওয়া হলেও দীর্ঘ তিন সপ্তাহ পর এই সিদ্ধান্ত আসায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বিরোধী শিবিরের নেতারা। প্রবীণ আইনজীবী ও সাংসদ কপিল সিবাল এই সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কেন সরানোর দাবি তুলেছিল বিরোধীরা?
তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি এবং ডিএমকে-সহ বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল অত্যন্ত গুরুতর। ১৯৩ জন সাংসদের (লোকসভার ১৩০ জন এবং রাজ্যসভার ৬৩ জন) স্বাক্ষরিত এই নোটিশে মূলত পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল:
১. ভোটে কারচুপি ও পক্ষপাতের অভিযোগ: নির্বাচন কমিশনকে বিজেপির ‘বি-টিম’ হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া এবং সরকারি মদতে ভোটে কারচুপির অভিযোগ।
২. ভোটার তালিকায় গরমিল (SIR): ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা Special Intensive Revision-এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করা। বিরোধীদের দাবি, এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়।
৩. নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম: জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না বলে দাবি করা হয়েছে।
৪. রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে মন্তব্য: লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ আনা হয়েছে সিইসি-র বিরুদ্ধে।
৫. ডিসেন্ট নোট উপেক্ষা: নিয়োগ প্যানেলের বৈঠকে রাহুল গান্ধী যে আপত্তি বা ‘ডিসেন্ট নোট’ দিয়েছিলেন, তা গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ।
কেন খারিজ হল প্রস্তাব?
সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, সিইসি-র মতো সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিকে সরাতে গেলে অন্তত ১০০ জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন, যা বিরোধীদের ছিল। কিন্তু রাজ্যসভার চেয়ারম্যান তাঁর সিদ্ধান্তে জানিয়েছেন, তিনি সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখেছেন। তাঁর মতে, অভিযোগগুলো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে, কিন্তু একজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করার মতো যথেষ্ট আইনি বা সাংবিধানিক ভিত্তি এগুলোতে নেই।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্পিকার বা চেয়ারম্যান একজন ‘বিচারপতি’ হিসেবে কাজ করেন। চেয়ারম্যানের মতে, অভিযোগগুলো ‘প্রমাণিত অসদাচরণ’ (Proved Misbehaviour)-এর আওতায় পড়ে না।
‘দ্বিমুখী নীতি’র অভিযোগ
এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে কপিল সিব্বল প্রশ্ন তুলেছেন, যখন শতাধিক সাংসদ সমবেত হয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, তখন তা আলোচনা ছাড়াই খারিজ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
তিনি আরও একটি বিস্ফোরক তুলনা টেনে আনেন। সিব্বলের দাবি, একদিকে এক বিচারকের ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব দেড় বছর ধরে সংসদে পড়ে রয়েছে, অন্যদিকে জ্ঞানেশ কুমারের রক্ষাকবচ হিসেবে মাত্র তিন সপ্তাহে সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেওয়া হলো। এর থেকেই সরকারের ‘মনোবাসনা’ স্পষ্ট হচ্ছে বলে তাঁর মত।
সিব্বল মনে করিয়ে দেন, ‘জাজেস ইনকোয়ারি অ্যাক্ট’ অনুযায়ী এই ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মূলত বিচার বিভাগের হওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, ১৯৫০ সালের পর দেশে এমন পরিস্থিতি আগে কখনো হয়নি যেখানে নির্বাচন কমিশনের ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস এভাবে উঠে যাচ্ছে।
২৫ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ কী?
পশ্চিমবঙ্গের এক ভয়াবহ চিত্র। বিরোধীদের দাবি, বর্তমান কমিশনারের অধীনে ভোটার তালিকা সংশোধনের যে পদ্ধতি চলছে, তাতে রাজ্যের ২৫ লক্ষ মানুষ ভোট দিতে পারবেন না।
যদি এই ধারা বজায় থাকে, তবে আগামীতে আরও ২০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যেতে পারে। এই বিশাল সংখ্যক নাগরিকের ভোটাধিকার হরণের দায় কে নেবে—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আদালতের পথে সংসদীয় লড়াই?
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আনা এই প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাওয়ায় আপাতত আইনি লড়াইয়ের পথ প্রশস্ত হলো। বিরোধীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের এই একতরফা সিদ্ধান্তকে তাঁরা উচ্চতর আদালতে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন।
গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রধানকে ঘিরে এই বিতর্ক দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল। ভোটারদের আস্থা ফেরানোই এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
এক নজরে ঘটনাক্রম:
৩ ফেব্রুয়ারি: মমতা ও অভিষেকের উপস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোর বৈঠক।
১২ মার্চ: লোকসভা ও রাজ্যসভায় ইমপিচমেন্ট নোটিশ জমা।
৬ এপ্রিল: স্পিকার ও চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রস্তাব খারিজ।
(Feed Source: zeenews.com)
