)
অয়ন শর্মা: রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক উদ্বেগজনক খবর সামনে এসেছে। আমাদের অতি পরিচিত জীবনদায়ী ওষুধ থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচারের অপরিহার্য সরঞ্জাম– সবই এখন প্রশ্নের মুখে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল ল্যাবরেটরির সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গুণমান যাচাইয়ের পরীক্ষায় ফেল করেছে ১৯৯টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধ, ইনজেকশন, স্যালাইন এবং গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম। এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য দফতর। অবিলম্বে এই সমস্ত সামগ্রীর ব্যবহার ও বিক্রি বন্ধের কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
আশঙ্কিত চিকিৎসকরা
সাধারণত আমরা ওষুধের গুণমান নিয়ে চিন্তিত থাকলেও, গজ, তুলো বা সূচের মতো সরঞ্জাম নিয়ে খুব একটা ভাবি না। কিন্তু ড্রাগ কন্ট্রোলের রিপোর্ট বলছে, এই সাধারণ সরঞ্জামগুলোই এখন বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংক্রামক ক্যাথিটার: হরিয়ানার একটি সংস্থার তৈরি ‘বেলুন ক্যাথিটার’ গুয়াহাটির কেন্দ্রীয় ড্রাগ ল্যাবে পরীক্ষায় ফেল করেছে। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এই ক্যাথিটারে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াল এনডোটক্সিন পাওয়া গিয়েছে, যা রোগীর শরীরে সরাসরি সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
অপরিচ্ছন্ন সূচ: হিমাচল প্রদেশ ও ফরিদাবাদের নামী সংস্থার তৈরি ‘হাইপোডারমিক সূচ’ (ইনজেকশনের সূচ) স্টেরিলিটি এবং ক্লিনলিনেস পরীক্ষায় ফেল করেছে। অর্থাৎ, এই সূচগুলো জীবাণুমুক্ত নয়। এর ব্যবহারে রক্তে বিষক্রিয়া বা সেপসিসের মতো প্রাণঘাতী সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নিম্নমানের তুলো: হিমাচল ও হরিয়ানার দুটি সংস্থার তৈরি তুলো কলকাতা ও কেরালার ল্যাবে গুণমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
ফেলের তালিকায় জীবনদায়ী ওষুধের লিস্ট
তালিকায় থাকা ওষুধের নামগুলো দেখে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বিশেষজ্ঞদের। কারণ, এর মধ্যে এমন অনেক ওষুধ রয়েছে যা প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যবহার করেন।
১. উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ: রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার অত্যন্ত পরিচিত ওষুধ টেলমিসার্টন (Telmisartan)-এর ১৯টি বিভিন্ন ব্র্যান্ড ফেল করেছে। হৃদরোগ বা কিডনির রোগীদের জন্য এই ওষুধ কাজ না করার অর্থ হলো তাঁদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা।
২. প্যারাসিটামল: সাধারণ জ্বর-ব্যথার অব্যর্থ ওষুধ হিসেবে পরিচিত ২১ ধরনের প্যারাসিটামল ও তার কম্পোজিশন গুণমান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছে।
৩. অ্যান্টিবায়োটিক: সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যবহৃত অ্যাজিথ্রোমাইসিন, অ্যামোক্সিসিলিন এবং ডক্সিসাইক্লিন-এর মতো অন্তত ২০ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট ও ইনজেকশন এই তালিকায় রয়েছে।
৪. গুরুতর ইনজেকশন ও স্যালাইন: প্রাণঘাতী সেপসিস ঠেকাতে ব্যবহৃত জেনটামাইসিন এবং মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শেষ অস্ত্র অ্যামিকাসিন ইনজেকশনও ফেল করেছে। এছাড়াও ৪ ধরনের সাধারণ স্যালাইন ও রিঙ্গার ল্যাক্টেড গুণমানে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
স্বাস্থ্য দফতরের কড়া পদক্ষেপ
রিপোর্টটি হাতে পাওয়ার পরেই রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। সেখানে স্পষ্ট জানানো হয়েছে:
অবিলম্বে ব্যবহার বন্ধ: রাজ্যের সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে এই নির্দিষ্ট ব্যাচের ওষুধ ও সরঞ্জাম ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
বাজার থেকে প্রত্যাহার: ওষুধ বিক্রেতা এবং হোলসেলারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের স্টকে এই সামগ্রী থাকলে তা যেন অবিলম্বে সাপ্লাই চেন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কেনা-বেচায় নিষেধাজ্ঞা: এই নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা ব্যাচের ওষুধের কোনওরকম কেনা-বেচা বা সেবন আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কতা
চিকিৎসকদের মতে, এই ধরণের নিম্নমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে অপারেশনের পর ইনফেকশন বেড়ে যাওয়া বা সাধারণ অসুখ জটিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই রোগীদের ওষুধ কেনার সময় সচেতন থাকা জরুরি। যদি বর্তমান প্রেসক্রিপশনে থাকা কোনও ওষুধ এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গুণমান পরীক্ষায় এই ব্যাপক ব্যর্থতা দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর নজরদারি ব্যবস্থার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন বসিয়ে দিয়েছে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে এই সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন চিকিৎসক মহলের একাংশ। আপাতত স্বাস্থ্য দফতরের এই নির্দেশিকা কতটা দ্রুত কার্যকর হয়, সেটাই দেখার।
(Feed Source: zeenews.com)
