জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে কি তবে আরও বড় কোনও সংঘাতের মেঘ ঘনিয়ে আসছে? একদিকে গাজা ও লেবাননে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে যখন কূটনৈতিক দৌড়ঝাপ তুঙ্গে, ঠিক তখনই পারস্য উপসাগরের উপকণ্ঠে আমেরিকার সামরিক তৎপরতা বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে ইরানি জলসীমার সন্নিকটে পাঠানো হয়েছে আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী রণতরী ‘ইউএসএস জর্জ বুশ’ (USS George Bush)-কে। এই বিশাল সমরসজ্জা দেখে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে একটাই প্রশ্ন– ট্রাম্প কি তবে ইরানি ভূখণ্ডে ‘বুটস অন গ্রাউন্ড’ বা সশরীরে সেনা পাঠিয়ে সরাসরি যুদ্ধের নীল নকশা তৈরি করছেন?
মার্কিন ‘আর্মাডা’
পেন্টাগন সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, ইউএসএস জর্জ বুশ একাই নয়, এর সঙ্গে রয়েছে এক বিশাল সামরিক বহর বা ‘আর্মাডা’। এই রণতরীর সঙ্গে রয়েছে কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং প্রায় ১০,০০০ উচ্চ প্রশিক্ষিত মার্কিন সেনা।
সাধারণত এই ধরনের সামরিক মোতায়েন তখনই করা হয়, যখন কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে বড় কোনো হামলার পরিকল্পনা থাকে। ইরানের মতো একটি শক্তিশালী দেশের দোরগোড়ায় এই বিশাল সেনাদল মোতায়েন করা কোনো সাধারণ রুটিন মহড়া হতে পারে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের রণকৌশল
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর পূর্ববর্তী মেয়াদ থেকেই ইরানের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়ে পরিচিত। এবার দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ (Maximum Pressure) নীতি আরও আগ্রাসী রূপ নিয়েছে।
ইরানের হুমকি মোকাবিলা: ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান উত্তেজনার মাঝে ইরান যেভাবে প্রক্সি ওয়ারের মাধ্যমে নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছে, তা রুখতেই এই শক্তিবৃদ্ধি।
বুটস অন গ্রাউন্ডের জল্পনা: যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার মাঝেই কেন ১০,০০০ সেনা পাঠানো হলো? অনেকেই মনে করছেন, যদি ইরান বা তার মদতপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো কোনো প্ররোচনা দেয়, তবে এবার আর আকাশপথে নয়, সরাসরি স্থলে সেনা নামিয়ে অভিযান চালাতে পারেন ট্রাম্প।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ এবং বৈপরীত্য
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই বিশাল রণসজ্জা এমন এক সময়ে ঘটছে যখন আন্তর্জাতিক মহল যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টায় ব্যস্ত। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্পের এক বিশেষ ধরণের ‘ডিপ্লোমেসি’। তিনি একদিকে আলোচনার টেবিল খোলা রাখছেন, অন্যদিকে সমরসজ্জার মাধ্যমে ইরানকে বার্তা দিচ্ছেন যে, আলোচনার পথে না এলে চরম পরিণতির জন্য তৈরি থাকতে হবে।
তবে ১০,০০০ সেনার এই উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকেও পালটা হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, তাদের জলসীমার কাছে কোনো ধরণের উস্কানি তারা সহ্য করবে না। ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডস (IRGC) ইতিমধ্যেই তাদের মিসাইল ব্যাটারিগুলোকে সক্রিয় করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ
আমেরিকার এই পদক্ষেপ নিয়ে ইতিমধ্যেই রাশিয়ার মতো দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই মোতায়েন স্রেফ ‘ডিফেন্সিভ’ বা আত্মরক্ষামূলক এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু ইউএসএস জর্জ বুশের মতো একটি ‘ফ্লোটিং সিটি’ বা ভাসমান শহরের উপস্থিতি আর শান্তিকামী দেশগুলোকে আশ্বস্ত করতে পারছে না।
ইরানে সেনা মোতায়েন আসলে কী?
১০,০০০ সেনা মোতায়েন করার অর্থ হল আমেরিকা যেকোনও বড় মাপের সংঘাতের জন্য প্রস্তুত। যদি ট্রাম্প সত্যিই ইরানে সেনা পাঠানোর (Boots on ground) ঝুঁকি নেন, তবে তা শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের তেলের বাজার এবং অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ‘পাওয়ার প্লে’ কি ইরানকে পিছু হটতে বাধ্য করবে, নাকি এক নতুন বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করবে— এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা বিশ্ব। পারস্য উপসাগরের নীল জলে মার্কিন রণতরীর ছায়া এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
(Feed Source: zeenews.com)
