
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: খাবার মানুষের জীবন বাঁচায়, কিন্তু সেই খাবারই যখন প্রাণ কেড়ে নেয়, তখন তা সমাজের জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি মুম্বইয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে যেখানে রাতের খাবারে বিরিয়ানি এবং পরে তরমুজ খেয়ে একই পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—ফুড পয়জনিং বা খাদ্য বিষক্রিয়া কি এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম?
ঘটনার বিবরণ
মুম্বইয়ের ওই পরিবার রাতের খাবারে বাইরে থেকে আনা বিরিয়ানি খেয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের বয়ান অনুযায়ী, বিরিয়ানি খাওয়ার পর তারা ডেজার্ট হিসেবে তরমুজও খেয়েছিলেন। খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই পরিবারের সকলের তীব্র বমি, পেটে ব্যথা এবং ডায়রিয়া শুরু হয়।
দ্রুত তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে একে একে তিনজনের মৃত্যু হয়। প্রাথমিক তদন্তে চিকিৎসকদের অনুমান, এটি ‘সিভিয়ার ফুড পয়জনিং’ বা তীব্র খাদ্য বিষক্রিয়ার একটি ঘটনা।
খাদ্য বিষক্রিয়া ও মৃত্যু: চিকিৎসকদের ব্যখ্যা
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ফুড পয়জনিং তো সাধারণ সমস্যা, এতে মৃত্যু হয় কীভাবে? এনডিটিভি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, ফুড পয়জনিং সবসময় সামান্য পেট খারাপে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর মৃত্যুর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে:
১. তীব্র ডিহাইড্রেশন (Dehydration): ক্রমাগত বমি ও ডায়রিয়ার ফলে শরীর থেকে জল ও প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট (পটাশিয়াম, সোডিয়াম) বেরিয়ে যায়। এর ফলে হৃদযন্ত্র বিকল হতে পারে বা কিডনি ফেইলিয়র হতে পারে।
২. ব্যাকটেরিয়াল টক্সিন (Toxins): কিছু ব্যাকটেরিয়া যেমন Salmonella, E. coli, বা Listeria শরীরে প্রবেশের পর বিষাক্ত টক্সিন নিঃসরণ করে যা সরাসরি রক্তে মিশে যায় (Sepsis)। এটি মাল্টি-অর্গান ফেইলিয়রের কারণ হতে পারে।
৩. বোটুলিজম (Botulism): এটি একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক খাদ্য বিষক্রিয়া যা স্নায়ুতন্ত্রকে প্যারালাইজ করে দিতে পারে এবং শ্বাসকষ্টের কারণে মৃত্যু ঘটাতে পারে।
বিরিয়ানি ও তরমুজ পরপর খাওয়া কি উচিত্ নয়?
মুম্বইয়ের এই ঘটনায় বিরিয়ানি এবং তরমুজের সংযোগ নিয়ে অনেক জল্পনা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, বিরিয়ানি যদি বাসি হয় বা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি হয়, তবে তাতে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর সম্ভাবনা প্রবল।
অন্যদিকে, তরমুজ যদি আগে থেকে কেটে রাখা হয় বা তাতে ইনজেকশনের মাধ্যমে রং মেশানো হয়, তবে তা বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে। অনেক সময় প্রোটিন সমৃদ্ধ ভারী খাবারের (বিরিয়ানি) পরপরই অত্যন্ত জলীয় ফল (তরমুজ) খেলে হজম প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে, যা ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তবে মৃত্যুর মূল কারণ সম্ভবত খাবারের মান, কম্বিনেশন নয়।
লক্ষণ যা অবহেলা করা উচিত নয়
ফুড পয়জনিং হলে সাধারণ পেট খারাপ ভেবে বাড়িতে বসে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। চিকিৎসকরা নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন:
টানা ২ দিনের বেশি ডায়রিয়া।
তীব্র জ্বর (১০২°F এর বেশি)।
দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া বা কথা বলতে অসুবিধা।
শরীরে জলের অভাবে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া।
বমির সাথে রক্ত আসা।
সতর্কতা ও প্রতিরোধ
এই ধরণের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়াতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি:
রাস্তার কাটা ফল এড়িয়ে চলুন: তরমুজ বা পেঁপের মতো ফল সবসময় আস্ত কিনুন এবং খাওয়ার ঠিক আগে কাটুন।
বাসি বিরিয়ানি বা মাংস: গরমের সময় মাংস জাতীয় খাবার খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফ্রিজ থেকে বের করে বারবার গরম করা খাবার এড়িয়ে চলুন।
পরিচ্ছন্নতা: বাইরে খাওয়ার সময় রেস্তোরাঁটি কতটা পরিচ্ছন্ন তা যাচাই করে নিন।
ক্রস-কন্টামিনেশন: কাঁচা সবজি এবং মাংস একই চপিং বোর্ডে কাটবেন না।
মুম্বইয়ের এই পরিবারটির মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, খাদ্য সুরক্ষা বা ফুড সেফটি নিয়ে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে তীব্র গরমের এই সময়ে খাবারের মান খুব দ্রুত পড়ে যায়। প্রশাসনের উচিত খাদ্য বিক্রেতাদের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো এবং সাধারণ মানুষের উচিত সচেতন হওয়া। মনে রাখবেন, আপনার সামান্য অসতর্কতা একটি সাজানো পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
(Feed Source: zeenews.com)
