
Shatadru Dutta on Arup Biswas: ক্রীড়ামন্ত্রীর এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতি এবং ক্রীড়ামহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পাল্টা মুখ খুলেছেন বিশিষ্ট ক্রীড়া উদ্যোগপতি শতদ্রু দত্তও। তিনি প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার মামলা করতে চলেছেন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়: ফুটবলপ্রেমী বাঙালির আবেগে আঘাত হেনেছিল ‘মেসিকাণ্ড’। সেই ঘটনার জল এবার বহুদূর গড়াতে চলেছে। অবশেষে খুলতে চলেছে মেসি কাণ্ডের দুর্নীতির ফাইল। আর এই ফাইল খোলার বার্তা খোদ রাজ্যের বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকের গলাতেই শোনা গেল। শুধু তাই নয়, এই কাণ্ডে যারা প্রতারিত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের টাকা ফেরত দিতে বর্তমান সরকার দায়বদ্ধ বলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি। ক্রীড়ামন্ত্রীর এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতি এবং ক্রীড়ামহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পাল্টা মুখ খুলেছেন বিশিষ্ট ক্রীড়া উদ্যোগপতি শতদ্রু দত্তও। তিনি প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার মামলা করতে চলেছেন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটি অন্যতম বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।
২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর ‘জি.ও.এ.টি. (GOAT) ইন্ডিয়া ট্যুর’-এর অংশ হিসেবে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে পা রেখেছিলেন লিওনেল মেসি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি পলের মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলাররা। কিন্তু মেসি মাঠে নামতেই চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সেলিব্রিটি, চিত্রগ্রাহক এবং ভিভিআইপি-দের হুড়োহুড়িতে মাঠের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
টাকা খরচ করে গ্যালারিতে বসা সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা, যাঁরা এক একটি টিকিটের জন্য ১২ হাজার টাকা বা তারও বেশি খরচ করেছিলেন, তাঁরা প্রিয় তারকাকে চোখের দেখাও দেখতে পাননি। অভিযোগ ওঠে, বিপুল সংখ্যক মানুষ বৈধ টিকিট বা পাস ছাড়াই স্টেডিয়ামে প্রবেশ করায় সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। নিরাপত্তাহীনতার কারণ দেখিয়ে মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যেই স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন মেসি। এর পর ক্ষুব্ধ দর্শকরা স্টেডিয়ামে ভাঙচুর চালায়, চেয়ার উপড়ে মাঠে ফেলে এবং বোতল ছুঁড়ে ক্ষোভ উগরে দেয়।
ক্রীড়ামন্ত্রীর বড় ঘোষণা
গত রবিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল ডার্বি ম্যাচ দেখতে এসেছিলেন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। সেখানেই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি মেসি কাণ্ড নিয়ে বড়সড় বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। মন্ত্রী বলেন,
‘মেসি কাণ্ডের ফাইল এবার খোলা হবে। সাধারণ মানুষ যারা এই ঘটনায় প্রতারিত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের টাকা ফেরত দিতে আমরা দায়বদ্ধ।’
এর পাশাপাশি ক্রীড়া উদ্যোগপতি শতদ্রু দত্তর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘শতদ্রু বাবু শুনলাম ১০০ কোটি টাকার মানহানির মামলা করবেন। তিনি যদি এই বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা চান, তবে আমরা তাঁকে অবশ্যই সব রকম সাহায্য করব।’ ক্রীড়ামন্ত্রীর এই আশ্বাস যে এই তদন্তে এক নতুন মোড় এনে দিল, তা বলাই বাহুল্য। মন্ত্রী বলেন, ‘সেদিন যা ঘটেছিল তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমরা ঘটনার সমস্ত ফাইল চেয়ে পাঠিয়েছি। পুরো বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে এবং যদি কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর পাশাপাশি তিনি সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবরটি দিয়েছেন সাধারণ দর্শকদের জন্য। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে সরকারের অন্দরে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তবে সরকারের এই ইতিবাচক মনোভাব প্রতারিত ফুটবলপ্রেমীদের মনে নতুন আশার আলো জাগিয়েছে।
শতদ্রুর বক্তব্য:
ক্রীড়ামন্ত্রীর রবিবারের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার সংবাদমাধ্যম ‘জি ২৪ ঘণ্টা’-কে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান ক্রীড়া উদ্যোগপতি শতদ্রু দত্ত। বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে শতদ্রু বাবু বলেন, ‘ক্রীড়ামন্ত্রীর রবিবারের বক্তব্য আমি শুনেছি। তিনি যে মেসি কাণ্ডের ফাইল খুলে ওই বড় দুর্নীতির তদন্ত করতে চাইছেন, তা জেনে সত্যিই খুব ভালো লাগল।’
একই সঙ্গে তিনি প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। শতদ্রু দত্ত জানান, তিনি অরূপ বিশ্বাস ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার মানহানির মামলা এবং আরও ৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিপূরণের মামলা করতে চলেছেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে মোট ১০০ কোটি টাকার মামলা ঠুকতে চলেছেন তিনি। খুব দ্রুত এই বিষয়ে পুলিসের কাছে এফআইআর (FIR) দায়ের করবেন বলেও জানান তিনি।
তদন্ত আড়াল করার চেষ্টা?
তদন্তের নির্দেশ দেওয়ায় বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে শতদ্রু দত্ত আগের তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর অভিযোগ, অতীতে এই বিষয়ে যে তদন্ত হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ প্রহসন। শতদ্রু বাবুর কথায়, ‘আগের তদন্তের মূল উদ্দেশ্যই ছিল তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা পুলিস আধিকারিকদের আড়াল করা। প্রকৃত দোষীদের বাঁচাতেই সেই তদন্তের নাটক করা হয়েছিল।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এই গোটা দুর্নীতিতে তাঁকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছিল। অন্যায়ভাবে তাঁর ওপর সমস্ত দোষ চাপিয়ে আসল অপরাধীদের আড়ালে রাখার চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি তাঁর।
তথ্যপ্রমাণ
আইনি লড়াইয়ে বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রীর পূর্ণ সহযোগিতা চেয়েছেন শতদ্রু দত্ত। তিনি বলেন, ‘আমি যাতে দ্রুত এফআইআর করে এই মামলা শুরু করতে পারি, তার জন্য বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রীর সহযোগিতা চাই।’
সেই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন যে, খুব তাড়াতাড়ি তিনি মাননীয় ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে চান। তাঁর কাছে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে, যা তিনি সরাসরি নিশীথ প্রামাণিকের হাতে তুলে দিতে চান। শতদ্রু বাবুর দাবি, এই তথ্যগুলির মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যাবে কী ভাবে প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ওই বড় দুর্নীতি পরিচালনা করেছিলেন এবং সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করেছিলেন।
আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেবে তদন্ত?
শতদ্রু দত্ত আশাবাদী যে, বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর এই তদন্ত প্রক্রিয়া আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে। একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির আসল সত্য সামনে আসবে, তেমনই অন্যদিকে নিজের আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্যও সরকারের সাহায্য পাবেন তিনি।
মেসি কাণ্ড নিয়ে ক্রীড়ামন্ত্রীর কড়া অবস্থান এবং শতদ্রু দত্তর ১০০ কোটি টাকার মামলার সিদ্ধান্ত— এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের অস্বস্তি যে আগামী দিনে আরও বাড়তে চলেছে, তা নিশ্চিত। এখন দেখার, বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রীর আশ্বাস অনুযায়ী প্রতারিত ফুটবলপ্রেমীরা তাঁদের টাকা ফেরত পান কিনা এবং এই হাইপ্রোফাইল তদন্তের জল শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
(Feed Source: zeenews.com)
