Supreme Court on Stray Dogs Removal: ঐতিহাসিক ‘সুপ্রিম’ রায়: রাস্তাঘাটে কোনওভাবেই থাকবে না পথকুকুর, সরাতেই হবে; হিংস্র বা পাগলা সারমেয়দের নিষ্কৃতিমৃত্যু

Supreme Court on Stray Dogs Removal: ঐতিহাসিক ‘সুপ্রিম’ রায়: রাস্তাঘাটে কোনওভাবেই থাকবে না পথকুকুর, সরাতেই হবে; হিংস্র বা পাগলা সারমেয়দের নিষ্কৃতিমৃত্যু

Supreme Court on Stray Dogs Case: এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর আদালত যে অন্তর্বর্তী নির্দেশিকা জারি করেছিল, পশুপ্রেমী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের (NGO) করা পুনর্বিবেচনার একগুচ্ছ আবেদন খারিজ করে মঙ্গলবারের শুনানিতে সেই আগের সিদ্ধান্তেই সম্পূর্ণ অনড় রইল আদালত। শীর্ষ আদালতের সাফ বার্তা, মানুষের জীবনের মূল্যে বা জননিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দেশের সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে শিশু ও অসুস্থ রোগীদের নির্ভয়ে এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারক রয়েছে বলেই মনে করে সর্বোচ্চ আদালত। আর এই অধিকারকে মর্যাদা দিতেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পথকুকুর সংক্রান্ত মামলায় ঐতিহাসিক রায় বহাল রাখল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি সন্দীপ মেহতা এবং বিচারপতি এন. ভি. আঞ্জারিয়ার সমন্বয়ে গঠিত শীর্ষ আদালতের একটি বিশেষ বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে– নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে ‘কুকুরের কামড়ের আতঙ্ক ছাড়া বাঁচার অধিকারও’ অন্তর্ভুক্ত।

এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর আদালত যে অন্তর্বর্তী নির্দেশিকা জারি করেছিল, পশুপ্রেমী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের (NGO) করা পুনর্বিবেচনার একগুচ্ছ আবেদন খারিজ করে মঙ্গলবারের শুনানিতে সেই আগের সিদ্ধান্তেই সম্পূর্ণ অনড় রইল আদালত। শীর্ষ আদালতের সাফ বার্তা, মানুষের জীবনের মূল্যে বা জননিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল পূর্ববর্তী অ্যানিম্যাল বার্থ কন্ট্রোল (ABC) বা পশু জন্ম নিয়ন্ত্রণ বিধির একটি বিশেষ নিয়মের সংশোধন। আগের নিয়ম অনুযায়ী, কুকুরদের রাস্তা থেকে ধরে বন্ধ্যাকরণ (Sterilisation) ও টিকাকরণ (Vaccination) করার পর আবার ঠিক সেই এলাকাতেই ছেড়ে দিতে হত।

তবে নতুন রায়ে সর্বোচ্চ আদালত এই সুনির্দিষ্ট স্থান ও সংবেদনশীল এলাকাগুলোর ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে:

পুনরায় ফেরত না দেওয়ার কড়া নির্দেশ: স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, এয়ারপোর্ট এবং স্পোর্টস কমপ্লেক্সের মতো জনাকীর্ণ ও অতি সংবেদনশীল এলাকা থেকে একবার কোনও বেওয়ারিশ কুকুরকে ধরা হলে, বন্ধ্যাকরণ ও টিকাকরণের পর তাকে আর কোনওভাবেই ওই একই চত্বরে বা পুরনো জায়গায় ফেরত পাঠানো যাবে না।

নির্দিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্র: সংগৃহীত এই সমস্ত কুকুরদের স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট ডগ শেল্টার বা পশু আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। সেখানে তাদের উপযুক্ত খাবার, জল ও চিকিৎসার মানবিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সীমানা বা প্রাচীর দিতে হবে: নতুন করে যাতে বাইরে থেকে কোনো কুকুর ঢুকতে না পারে, সেজন্য সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হাবগুলোর চারপাশে যথাযথভাবে বেষ্টনী বা ফেন্সিং (Fencing) দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চরম রোগাক্রান্ত বা হিংস্র কুকুরের ক্ষেত্রে ‘ইউথানাসিয়া’র অনুমতি

পশুপ্রেমীদের আবেদন খারিজ করার পাশাপাশি এই রায়ে আদালত একটি অত্যন্ত কঠোর ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, যদি কোনও পথকুকুর চরম রোগাক্রান্ত, জলাতঙ্কে আক্রান্ত অথবা অত্যন্ত হিংস্র ও বিপজ্জনক প্রকৃতির হয়, তবে সেটির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম ও আইনি গাইডলাইন মেনে ‘ইউথানাসিয়া’ (Euthanasia) বা যন্ত্রণাহীন নিষ্কৃতি মৃত্যুর পথ অবলম্বন করা যাবে।

প্রশাসনিক জবাবদিহি

আদালত এই নির্দেশ স্রেফ কাগজের কলমে সীমাবদ্ধ রাখতে রাজি নয়। পথকুকুরদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যথেষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচির অভাব থাকার কারণে দেশের রাজ্যগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছে শীর্ষ আদালত।

বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কঠোরতা বজায় রাখতে আদালত কিছু কড়া প্রশাসনিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে দিয়েছে:

১. আইনি সুরক্ষা: নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্য সচিবদের (Chief Secretaries) ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হয়েছে। তবে, জনস্বার্থে এই নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে পুরসভা বা প্রশাসনের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর (FIR) দায়ের করা যাবে না বলে তাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

২. নোডাল অফিসার নিয়োগ: প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক এলাকায় একজন করে ‘নোডাল অফিসার’ নিয়োগ করা হবে, যিনি এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করবেন। এছাড়া স্থানীয় পৌরসভা, কর্পোরেশন এবং পঞ্চায়েতগুলোকে আগামী তিন মাস প্রতি সপ্তাহে বা নিয়মিত বিরতিতে এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে হবে।

৩. পরিকাঠামো উন্নয়ন ও স্ট্যাটাস রিপোর্ট: দেশের প্রতিটি জেলায় বাধ্যতামূলকভাবে পশু জন্মনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র চালু করতে হবে এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টি-রেবিস ভ্যাকসিনের (Anti-Rabies Vaccine) বন্দোবস্ত রাখতে হবে। আগামী ৮ সপ্তাহের মধ্যে এই নির্দেশ কতটা বাস্তবায়িত হলো, তা নিয়ে প্রতিটি রাজ্যকে ‘স্ট্যাটাস রিপোর্ট’ জমা দিতে হবে এবং পুরো বিষয়টি তদারকি করবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের হাইকোর্ট।

যত্রতত্র খাওয়ানোর উপর নিষেধাজ্ঞা

রাস্তায় যত্রতত্র কুকুরকে খাবার খাওয়ানোর প্রবণতা নিয়েও সুপ্রিম কোর্ট কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মূল পাবলিক রাস্তা, হাইওয়ে বা জনাকীর্ণ ফুটপাতে বেওয়ারিশ কুকুরদের খাওয়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কারণ এর ফলে কুকুরের দল এক জায়গায় জড়ো হয়ে পথচারী ও যানচলাচলের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।

তবে প্রাণী অধিকারের বিষয়টি বিবেচনা করে স্থানীয় প্রশাসনকে প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট ‘ফিডিং জোন’ বা খাবার দেওয়ার জায়গা নির্ধারণ করে সেখানে নোটিশ বোর্ড টাঙানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে গিয়ে কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সামাজিক সংকট

সুপ্রিম কোর্টের এই বিরাট হস্তক্ষেপের পিছনে রয়েছে দেশজুড়ে কুকুরের কামড়ে শিশুসহ অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর মতো দুর্ভাগ্যজনক ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। সম্প্রতি দিল্লিতে একটি ৬ বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রবীণ নাগরিক ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ওপর হওয়া পথকুকুরদের হিংস্র আক্রমণের ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে আদালত। ভারতজুড়ে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হন এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ভারতের  গ্রাম, শহর এবং নাগরিক সুরক্ষার ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক বলেই মনে করছে অনেক অভিভাবক বিশেষত যাঁদের বাড়িতে ছোট ছেলেমেয়ে রয়েছে। এই রায় শিশুদের এবং রোগীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করল। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বন্ধ্যাকরণ ও নির্দিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে পশু কল্যাণের পথও খোলা রাখল। এখন দেখার বিষয়, রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় পৌর সংস্থাগুলো আদালতের বেঁধে দেওয়া ৮ সপ্তাহের সময়সীমার মধ্যে এই নির্দেশ বাস্তবায়নে কতটা তৎপরতা দেখায়।

(Feed Source: zeenews.com)