
২০২৫ সালের ১২ জুন লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারটি আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের মাত্র ৩২ সেকেন্ড পর ভেঙে পড়ে। বিমানে থাকা ২৪২ জনের মধ্যে ২৪১ জনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি মাটিতে থাকা আরও ১৯ জন প্রাণ হারান।
তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই ককপিটে দুর্ঘটনার ঠিক আগে কী ঘটেছিল তা নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে কেন এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে এখনও তীব্র বিতর্ক চলছে। চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট এখনও প্রকাশ না হওয়ায় একাধিক তত্ত্ব সামনে এসেছে– ইচ্ছাকৃতভাবে পাইলটের পদক্ষেপ, মানবিক ভুল, প্রযুক্তিগত ত্রুটি অথবা বিমান ব্যবস্থার কোনও অজানা সমস্যার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে ভারতের এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB)-এর ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত প্রাথমিক রিপোর্টে। তদন্তে জানা যায়, ওড়ার কয়েক সেকেন্ড পর ককপিটে থাকা দুটি ‘ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ’ই “RUN” থেকে “CUTOFF” অবস্থানে চলে যায়। এর ফলে দুই ইঞ্জিনেই জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই থ্রাস্ট বা শক্তি হারায় বিমানটি। দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে সেটি আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের কাছাকাছি কয়েকটি ভবনের উপর ভেঙে পড়ে।
পরবর্তীতে সুইচ দুটিকে আবার “RUN” অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল এবং পাইলটরা ইঞ্জিন পুনরায় চালু করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিমানটিকে বাঁচানোর মতো পর্যাপ্ত সময় বা উচ্চতা তখন আর অবশিষ্ট ছিল না। প্রাথমিক রিপোর্টে আরও বলা হয়, বোয়িং ৭৮৭-এর কোনও সিস্টেম ত্রুটি বা জিই অ্যারোস্পেসের তৈরি ইঞ্জিনে তাৎক্ষণিক কোনও সমস্যার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তাতেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি— সুইচ দুটো সরিয়েছিল কে, বা কী কারণে সেগুলি সরে গিয়েছিল?
AI171-এর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন ৫৬ বছর বয়সি ক্যাপ্টেন সুমিত সবরওয়াল এবং ৩২ বছর বয়সি ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্দর। ক্যাপ্টেন সবরওয়াল ছিলেন এয়ার ইন্ডিয়ার অন্যতম অভিজ্ঞ পাইলট। তাঁর উড়ান অভিজ্ঞতা ছিল ১৫,৬০০ ঘণ্টারও বেশি, যার মধ্যে ৮,৫০০ ঘণ্টার বেশি ছিল বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারে। ২০১৭ সালে এয়ার ইন্ডিয়ায় যোগ দেওয়া ক্লাইভ কুন্দরের উড়ান অভিজ্ঞতা ছিল ৩,৪০০ ঘণ্টারও বেশি। উভয়েই প্রয়োজনীয় সমস্ত শংসাপত্রপ্রাপ্ত এবং বোয়িং ৭৮৭ পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ যোগ্য ছিলেন।
তবুও পাইলটের ভুল বা ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপের তত্ত্ব গুরুত্ব পায়, কারণ ফুয়েল সুইচগুলিতে বিশেষ লকিং ব্যবস্থা থাকে যা দুর্ঘটনাবশত সক্রিয় হওয়া ঠেকানোর জন্য তৈরি। বিমান বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় একই সময়ে দুটি সুইচ সরাতে সাধারণত সচেতন পদক্ষেপ প্রয়োজন হয়। তবে AAIB বারবার সতর্ক করেছে যে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটি বিভিন্ন জল্পনামূলক প্রতিবেদন খারিজ করে জানায়, তদন্ত এখনও চলছে। এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি রিপোর্টে এই দুর্ঘটনার জন্য ইচ্ছাকৃত পাইলট পদক্ষেপকে দায়ী করা হয়নি।
বৃহস্পতিবারও FIP দাবি করেছে, বিমানটিতে “অসংখ্য সমস্যা” ছিল, যার মধ্যে বৈদ্যুতিক ত্রুটিও অন্তর্ভুক্ত। তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
FIP-এর সভাপতি ক্যাপ্টেন সিএস রনধাওয়া বলেন, প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে একাধিক ফাঁকফোকর রয়েছে। তাঁর দাবি, দিল্লি থেকে আহমেদাবাদে আসার সময় বিমানটির স্ট্যাবিলাইজার সংক্রান্ত সমস্যা ছিল। পরে মোটর বদলানোর পর সেটিকে পরিষেবার উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, বিমানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য যন্ত্রাংশে প্রভাব ফেলেছিল এমন বৈদ্যুতিক সমস্যাও ছিল। তিনি প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখিত সময়সূচি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। রনধাওয়ার আরও দাবি, ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের যে অংশ উদ্ধৃত করা হয়েছে তা মাত্র দুই সেকেন্ডের, অথচ “পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম এটিকে ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছে।”
তদন্তকারীদের অধিকাংশই একটি বিষয়ে একমত– উড়ানের পর ককপিটের ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ “CUTOFF” অবস্থানে চলে যাওয়ার ফলে দুই ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং তার জেরেই এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট AI171 ভেঙে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি– সুইচগুলি কি ইচ্ছাকৃতভাবে সরানো হয়েছিল, দুর্ঘটনাবশত সরে গিয়েছিল, নাকি কোনও অজানা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছিল?
(Feed Source: news18.com)
