)
Organ Donation:ব্রেন ডেড স্বামী হেমন্ত কুমারের অঙ্গদান করে এক অনন্য নজির গড়েছেন স্ত্রী বরখা আগরওয়াল। তাঁর দান করা লিভার ও কিডনি বাঁচিয়েছে একাধিক প্রাণ। কিন্তু আমাদের সমাজে আজও অঙ্গদান নিয়ে রয়েছে নানা ভয় ও কুসংস্কার। কীভাবে কাজ করে সরকারি ব্যবস্থা ‘NOTTO’? কীভাবে করবেন রেজিস্ট্রেশন?
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মৃত্যুর পরেও কি মানুষ বেঁচে থাকতে পারে? উত্তরটা হলো, হ্যাঁ পারে। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন মেরঠের বাসিন্দা হেমন্ত কুমার আগরওয়াল। তিনি আজ সশরীরে এই পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাঁর দান করা অঙ্গের মাধ্যমে তিনি আজও বেঁচে আছেন অন্য কারোর মধ্যে। ২০২০ সালের ১২ মার্চ চিকিৎসকরা তাঁকে ‘ব্রেন ডেড’ ঘোষণা করেন। সেই কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁর পরিবার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। হেমন্ত বাবুর দুটি কিডনি এবং লিভার দান করা হয়। এমনকি তাঁর লিভারটি ‘স্প্লিট’ বা দ্বিখণ্ডিত করে একজন শিশু এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে নতুন জীবন দেওয়া হয়েছে।
আজ হেমন্ত বাবুর মৃত্যুর পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে, কিন্তু তাঁর স্ত্রী বরখা আগরওয়াল আজও স্বামীর ছবিতে মালা দেননি। গর্বের সঙ্গে তিনি বলেন, “আমার আর আমার সন্তানদের কাছে তিনি আজও মারা যাননি, বরং কারও না কারও রূপ নিয়ে এই পৃথিবীতেই নিঃশ্বাস নিচ্ছেন।”

অঙ্গদান নিয়ে ভয় ও কুসংস্কার কেন?
আমাদের সমাজে আজও অঙ্গদান নিয়ে সচেতনতার প্রবল অভাব রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, চিকিৎসকরা হয়তো অঙ্গ বিক্রি করে দেন বা এর পেছনে কোনো বড় কারচুপি থাকে। কিন্তু বরখা দেবীর অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ উল্টো। তিনি জানান, অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর স্বামীর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ভারতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং আইনি নিয়মে বাঁধা।
স্বচ্ছতা বজায় রাখে ‘নোটো’ (NOTTO)
অঙ্গদান সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য ভারত সরকারের একটি বিশেষ সংস্থা রয়েছে, যার নাম NOTTO (National Organ and Tissue Transplant Organisation)।
অনলাইন নেটওয়ার্ক: দেশে যখনই কোনো অঙ্গদান হয়, তার সমস্ত রেকর্ড এই সরকারি পোর্টালে অনলাইন নথিভুক্ত থাকে।
কম্পিউটারাইজড ওয়েটিং লিস্ট: রোগীর অসুস্থতার তীব্রতা, ব্লাড গ্রুপ এবং অর্গান ম্যাচিংয়ের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ কম্পিউটার চালিত ওয়েটিং লিস্ট অনুযায়ী ঠিক হয় কে অঙ্গ পাবেন। এতে মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ চলে না।
কঠোর আইন (THOA): ‘ট্রান্সপ্লান্টেশন অফ হিউম্যান অর্গানস অ্যাক্ট’ (THOA) অনুযায়ী অঙ্গ কেনাবেচা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
গোপনীয়তা: কোনো প্রকার বাণিজ্যিক লেনদেন আটকাতে অঙ্গদাতা ও গ্রহীতার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়।
কীভাবে করবেন অঙ্গদান?
অঙ্গদান মূলত দু-রকমের হয়— ‘লিভিং ডোনেশন’ (জীবিত অবস্থায় কিডনি বা লিভারের অংশ দান) এবং ‘ডিসিজড ডোনেশন’ (ব্রেন ডেড ঘোষণার পর চোখ, হার্ট, লিভার, কিডনি ইত্যাদি দান)।
আপনি যদি অঙ্গদানের জন্য আবেদন করতে চান, তবে সরাসরি notto.mohfw.gov.in ওয়েবসাইটে গিয়ে ‘Register’ বাটনে ক্লিক করতে হবে। এছাড়া ‘MOHAN Foundation’ বা ‘Organ India’ র মতো সংস্থার মাধ্যমেও ফর্ম পূরণ করা যায়। ফর্মে আপনার নাম, ঠিকানা, ব্লাড গ্রুপ ও দুজন সাক্ষীর (পরিবারের সদস্য হতে পারেন) নাম দিয়ে ওটিপি (OTP) ভেরিফাই করলেই আপনার ‘অর্গান ডোনার কার্ড’ তৈরি হয়ে যাবে। এর জন্য কোনো টাকা লাগে না। তবে ফর্ম ভরার পর নিজের পরিবারকে অবশ্যই এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে রাখা উচিত, কারণ মৃত্যুর পর পরিবারের লিখিত অনুমতি ছাড়া অঙ্গদান সম্ভব নয়।
অঙ্গদান নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা ও সত্য:
ভুল ধারণা- অঙ্গদানের ফর্মে সই করলে ডাক্তাররা রোগীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন না।
সত্যি- চিকিৎসকদের প্রথম কাজ জীবন বাঁচানো। ‘ব্রেন ডেড’ ঘোষণার পরই শুধু অঙ্গদানের কথা ওঠে।
ভুল ধারণা- বাড়িতে স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও সব অঙ্গ দান করা যায়।
সত্যি- স্বাভাবিক মৃত্যু হলে শুধু চোখ (কর্নিয়া) দান করা সম্ভব, অন্য অঙ্গ নয়।
ভুল ধারণা- অঙ্গ বের করার পর মৃতদেহ বিকৃত হয়ে যায়।
সত্যি- সাধারণ অপারেশনের মতো অত্যন্ত সম্মানের সাথে অঙ্গ নেওয়া হয়, বাইরে কোনো দাগ বা বিকৃতি থাকে না।
ভুল ধারণা- অঙ্গদানের জন্য পরিবারকে টাকা দিতে হয়।
সত্যি- এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নিখরচায় হয়, উল্টে চিকিৎসার কোনো খরচও পরিবারকে দিতে হয় না।
ভুল ধারণা- বয়স বেশি হলে বা রোগ থাকলে অঙ্গ কাজে লাগে না।
সত্যি- বয়স কোনো বাধা নয়, মৃত্যুর পর চিকিৎসকরা পরীক্ষার মাধ্যমে ঠিক করেন কোন অঙ্গটি সুস্থ ও ব্যবহারযোগ্য।
আমাদের দেশে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ শুধু সময়ের ওপর অঙ্গ না পাওয়ার কারণে মারা যান। হেমন্ত বাবুর গল্প আমাদের শেখায় যে, জীবনের শেষ বেলাতেও আমরা অন্য কারও প্রদীপ জ্বালিয়ে যেতে পারি। আসুন, অঙ্গদানের সংকল্প নিই এবং মানবসেবায় শামিল হই।
(Feed Source: zeenews.com)
