
Bankura News: প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য আজও নিষ্ঠার সঙ্গে বহন করে চলেছেন পরিবারের সদস্যরা। কারণ জানলে চমকে যাবেন আপনিও
বাঁকুড়া, নীলাঞ্জন ব্যানার্জী: বাঁকুড়া জেলার আঁচুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পশ্চিম সানাবাঁধ গ্রামের একটি পাড়ার নামই এখন সকলের কাছে পরিচিত “রাম পাড়া” নামে। এই পাড়ার বিশেষত্ব একেবারেই অনন্য। এখানে বসবাসকারী সাতটি মুখার্জী পরিবারের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন পুরুষ সদস্যের নামের শুরুতেই রয়েছে “রাম”। কারও নাম রামচরণ, কারও রামশরণ, কারও রামরঞ্জন, আবার কারও রামানন্দ। বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ব্যতিক্রমী রীতি আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। পরিবারের কোনও পুত্রসন্তানের জন্ম হলে তার নামের শুরুতেই “রাম” শব্দটি যুক্ত করা হয়। শুধু তাই নয়, একবার যে নাম ব্যবহার করা হয়েছে, ভবিষ্যতে সেই একই নাম আর দ্বিতীয়বার রাখা হয় না। ফলে প্রতিটি নামই স্বতন্ত্র, আর সেই নামের মধ্যেই বহন করে চলে পারিবারিক ঐতিহ্য ও ভগবান শ্রীরামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
এই গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অযোধ্যার এক ঐতিহাসিক যোগসূত্র। স্থানীয়দের বিশ্বাস, প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বছর আগে অযোধ্যা থেকে কর্মসূত্রে রামসরণ মুখার্জী এই এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর হাত ধরেই পশ্চিম সানাবাঁধে প্রতিষ্ঠিত হয় শালগ্রাম শীলার নিরাকার শ্রীরাম। সেই থেকেই এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে রাম পাড়ার পরিচয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু প্রজন্ম পেরিয়ে গেলেও সেই ঐতিহ্যে কোনও ভাটা পড়েনি। বরং পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া বিশ্বাস ও সংস্কারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে আগলে রেখেছেন বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরাও।
বর্তমানে সাতটি মুখার্জী পরিবারের সকলেই এই প্রাচীন মন্দিরের সেবাইত। পালাক্রমে প্রতিদিন তিনবার ভগবান রামের নিত্যপুজো, ভোগ নিবেদন ও আরতি সম্পন্ন করা হয়। এই দায়িত্ব কোনও একজনের নয়, বরং গোটা পরিবারের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই নিয়মে পূজা-অর্চনা চলে আসছে। শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এই মন্দিরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পরিবারের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন। গ্রামের প্রবীণ থেকে নবীন—সকলেই এই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। তাই রাম পাড়া আজ শুধু একটি পাড়ার নাম নয়, এটি এক পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং বিশ্বাসের প্রতীক।
রাম পাড়ার এক বর্ষীয়ান বাসিন্দা বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরা যে ঐতিহ্য গড়ে দিয়ে গিয়েছেন, আমরা শুধু সেটাই ধরে রাখার চেষ্টা করছি। আট পুরুষ ধরে এই মন্দিরের সেবা ও পূজা চলে আসছে। আমাদের পরিবারের প্রত্যেকেই ভগবান রামের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যাতে এই ঐতিহ্যকে একইভাবে সম্মান করে এবং রক্ষা করে, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আশা।” আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন বহু প্রাচীন রীতি হারিয়ে যাচ্ছে, তখন পশ্চিম সানাবাঁধের এই রাম পাড়া আজও শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, পারিবারিক সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে সমান নিষ্ঠায় বাঁচিয়ে রেখে বাঁকুড়ার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।
