
Gold Treasure: প্রাচীনকালে মানুষ কেন ব্যাঙ্কে নয়, মাটির নিচে সোনা-রুপো লুকিয়ে রাখতেন? যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা, চুরি-ডাকাতির ভয় এবং প্রাচীন সভ্যতার নানা বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এর ইতিহাস। এখনও কেন মাটির নিচে গুপ্তধন মিলছে, জানুন বিস্তারিত।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খনন, নির্মাণকাজ বা পুরনো বাড়ি ভাঙার সময় একাধিকবার মাটির নিচে পুঁতে রাখা সোনা, রুপোর মুদ্রা বা মূল্যবান অলঙ্কার উদ্ধার হয়েছে ৷ শত শত বছরের পুরনো গয়না ও মূল্যবান ধাতুর উদ্ধার হয়ে মাঠিক নীচ থেকে ৷ স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে যে মানুষ কেন তাঁদের মূল্যবান সম্পদ মাটির নিচে লুকিয়ে রাখতেন?
News18 Kannada-এর একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মাটির নিচে গুপ্তধন লুকিয়ে রাখার গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কৌতূহলের বিষয়। প্রাচীন রাজ্য, সাম্রাজ্য, জলদস্যু কিংবা রাজাদের গুপ্তধনের গল্পে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা সোনার উল্লেখ প্রায়ই দেখা যায়। তবে এটি শুধু লোককথা নয়, ইতিহাস বলছে তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই মানুষ সত্যিই তাঁদের মূল্যবান সম্পদ মাটির নিচে পুঁতে রাখতেন।
তখন ছিল না ব্যাঙ্ক বা লকারের সুবিধা – বর্তমানে টাকা, সোনা বা মূল্যবান সামগ্রী নিরাপদে রাখার জন্য ব্যাঙ্ক, লকার এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কয়েকশো বছর আগে এসবের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। তাই মানুষ তাঁদের সোনার মুদ্রা, অলঙ্কার, রুপো এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিস মাটির নিচে পুঁতে রাখাকেই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি বলে মনে করতেন। বিশেষ করে রাজা, বড় ব্যবসায়ী, জমিদার ও ধনী পরিবারগুলি মাটির হাঁড়ি, তামার পাত্র বা কাঠের বাক্সে সম্পদ ভরে গোপনে মাটির নিচে পুঁতে রাখতেন। সেই জায়গার কথা পরিবারের খুব অল্প কয়েকজন সদস্যই জানতেন।
কোথায় লুকিয়ে রাখা হতো? তৎকালীন মানুষ খুবই সতর্কতার সঙ্গে বাড়ির পিছনের বাগান, কৃষিজমি, ভূগর্ভস্থ ঘর, কুয়োর আশপাশ বা এমন জায়গা বেছে নিতেন যেখানে কারও সন্দেহ হওয়ার সম্ভাবনা কম। আধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় পরে সেই জায়গা খুঁজে বের করাও অত্যন্ত কঠিন ছিল। ফলে বহু গুপ্তধন বছরের পর বছর মাটির নিচেই থেকে যেত।
যুদ্ধ ও আক্রমণের ভয় প্রাচীন যুগে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ এবং বিদেশি আক্রমণ ছিল নিয়মিত ঘটনা। শত্রুপক্ষ আক্রমণ করতে পারে—এমন খবর পেলেই পরিবারগুলি দ্রুত তাঁদের সোনা, রুপো ও মূল্যবান সামগ্রী মাটির নিচে পুঁতে রাখতেন। যুদ্ধ শেষ হলে তা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা যুদ্ধে মারা যেতেন, গ্রাম ধ্বংস হয়ে যেত বা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হতেন। ফলে সেই সম্পদ আর উদ্ধার করা সম্ভব হতো না। সম্প্রতি কর্ণাটকের গদাগ জেলার লক্কুন্ডি এলাকায় কোটি কোটি টাকার প্রাচীন সোনার ভাণ্ডার উদ্ধারের ঘটনাও ইতিহাসবিদদের মতে এমনই কোনও পরিস্থিতির ফল।
চুরি-ডাকাতির ভয়ও ছিল বড় কারণ আগেকার দিনে বাড়িতে প্রচুর সোনা বা রুপো রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে ব্যবসায়ী, মহাজন ও শাসকদের কাছে বিপুল সম্পদ থাকত। তখন পুলিশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সিসিটিভির মতো কোনও আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় চুরি-ডাকাতির আশঙ্কা ছিল অনেক বেশি। তাই মানুষ বিশ্বাস করতেন, বাড়িতে রাখার চেয়ে গোপনে মাটির নিচে পুঁতে রাখাই সম্পদ রক্ষার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
অনেক গুপ্তধন আর উদ্ধারই করা যায়নি অনেক ক্ষেত্রেই যিনি সম্পদ পুঁতে রাখতেন, তিনি যুদ্ধ, রোগ, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনও কারণে হঠাৎ মারা যেতেন। পরিবারের কাউকে গুপ্তধনের অবস্থান জানিয়ে যেতে না পারায় সেই সম্পদ চিরতরে মাটির নিচেই থেকে যেত।
এই প্রথার শুরু হাজার হাজার বছর আগে-ইতিহাস বলছে, মূল্যবান সামগ্রী মাটির নীচে পুঁতে রাখার প্রথা বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলির সময় থেকেই শুরু হয়েছিল। প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া এবং সিন্ধু সভ্যতার মানুষ মৃত্যুর পরের জীবনেও বিশ্বাস করতেন। তাই রাজা বা ধনী ব্যক্তির মৃত্যুর সময় তাঁদের সমাধিতে সোনা, রুপো, গয়না ও মূল্যবান সামগ্রীও সমাহিত করা হতো। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরও এসব সম্পদের প্রয়োজন হবে।খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে ধাতব মুদ্রার ব্যবহার বাড়তে শুরু করলে মানুষ মুদ্রার আকারে সম্পদ সঞ্চয় করতে থাকেন। প্রাচীন গ্রিস, রোমান সাম্রাজ্য এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সোনার ও রুপোর মুদ্রা মাটির হাঁড়িতে ভরে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। সেই সময়ে এটি এক ধরনের ‘ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক’ হিসেবে কাজ করত। প্রয়োজন হলেই মানুষ সেই গুপ্তধন তুলে ব্যবহার করতেন।
এখনও কেন মিলছে এমন গুপ্তধন?বর্তমানেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন, নির্মাণকাজ বা পুরনো বাড়ি ভাঙার সময় প্রাচীন মুদ্রা, সোনার অলঙ্কার এবং মূল্যবান গুপ্তধন উদ্ধার হয়।ইতিহাসবিদদের মতে, এগুলির বেশিরভাগই বহু শতাব্দী আগে যুদ্ধ, লুটপাট, আকস্মিক মৃত্যু বা অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।তাই মাটির নিচে পুঁতে রাখা গুপ্তধনের গল্প শুধু লোককথা বা সিনেমার কল্পনা নয়। ইতিহাস স্পষ্ট জানায়, নিরাপত্তার অভাব, যুদ্ধের আতঙ্ক, চুরি-ডাকাতির ঝুঁকি এবং আকস্মিক পরিস্থিতির কারণে মানুষ একসময় তাঁদের মূল্যবান সম্পদ মাটির নিচে লুকিয়ে রাখাকেই সবচেয়ে নিরাপদ উপায় বলে মনে করতেন।
(Feed Source: news18.com)
