মহারাষ্ট্রে বৃষ্টির বলি ১৩! পুণেয় বিভিন্ন এলাকায় ধস, জলের তলায় মুম্বই

মহারাষ্ট্রে বৃষ্টির বলি ১৩! পুণেয় বিভিন্ন এলাকায় ধস, জলের তলায় মুম্বই

 

India

-Ritesh Ghosh

টানা অতিবৃষ্টির জেরে কার্যত স্তব্ধ মহারাষ্ট্রের জনজীবন। মুম্বই ও পুণে সহ রাজ্যের একাধিক জেলায় লাল সতর্কতা (রেড অ্যালার্ট) জারি করেছে আবহাওয়া দফতর। রবি ও সোমবারের রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টির জেরে মুম্বই-পুণে অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় একাধিক জায়গায় বড়সড় ধস নেমেছে। ফলে সড়ক ও রেল যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বন্ধ রাখা হয়েছে মুম্বই-পুণে এক্সপ্রেসওয়ে এবং বাতিল করা হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দূরপাল্লার ট্রেন।

দুর্যোগের আশঙ্কায় সোমবার মুম্বই, পুণে, থানে এবং পালঘর জেলার সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। অতিবৃষ্টির কারণে দুই শহর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল জুড়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বহু নিচু এলাকায় জল জমে স্বাভাবিক যাতায়াত সম্পূর্ণ ব্যাহত হচ্ছে। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ঘরের বাইরে না বের হতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Flooded expressway traffic during heavy rains in Maharashtra

বৃষ্টির জেরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মুম্বই ও পুণের মধ্যের রেল পরিষেবার। মধ্য রেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কারজাত ও লোনাভলা সংলগ্ন ভোর ঘাট এলাকায় পাহাড় থেকে বিশাল কাদা ও পাথরের ধস নেমেছে। ঠাকুরওয়াড়ি, খন্ডালা এবং মাঙ্কি হিল লুপ কেবিনের মধ্যবর্তী অংশে রেল লাইনের ওপর পাথর জমে যাওয়ায় এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল থমকে যায়। মুম্বই ও পুণের সংযোগকারী তিনটি মূল লাইনের ওপরেই ধস নামায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে।

রেলওয়ের জনসংযোগ আধিকারিক স্বপ্নীল নীলা জানিয়েছেন, রেল লাইনগুলি পরিষ্কার করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চলছে। তবে যাত্রী সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে ইতিমধ্যেই অন্তত ১৬টি দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল করা হয়েছে এবং ৯টি ট্রেনের রুট পরিবর্তন করা হয়েছে। বাতিল ট্রেনের তালিকায় রয়েছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ডেকান কুইন, ইন্দ্রায়ণী এক্সপ্রেস, ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস, প্রগতি এক্সপ্রেস এবং সিংহগড় এক্সপ্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলি। বহু ট্রেনকে মাঝপথেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বন্ধ মুম্বই-পুণে এক্সপ্রেসওয়ে, স্তব্ধ যান চলাচল

রেলপথের পাশাপাশি দুই মহানগরের মূল সড়ক যোগাযোগও সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে মুম্বই-পুণে এক্সপ্রেসওয়ে এবং পুরনো মুম্বই-পুণে হাইওয়ের উভয় লেনের যান চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে পুলিশ। খোপোলি-কুসগাওঁ টানেলের কাছে ধস নামায় প্রথমে যান চলাচল কেবল ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়। ধসের ধাক্কায় এক্সপ্রেসওয়ের ওপর একটি বিশালাকার কংক্রিটের পিলার ভেঙে পড়ার কারণে রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়।

মহারাষ্ট্র সড়ক উন্নয়ন কর্পোরেশন এবং হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশ যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। তবে মাভাল এবং তামহিনী ঘাট এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কারণে বিকল্প পাহাড়ি রাস্তাগুলিও জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জারি করা সতর্কবার্তায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পুণে ও মুম্বইয়ের মধ্যে যেন কেউ যাতায়াত না করেন। যারা রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের যাত্রা স্থগিত রাখার তীব্র অনুরোধ জানানো হয়েছে।

পুণেতে ধসে মৃত্যু ও এনডিআরএফ-এর উদ্ধার অভিযান

প্রবল বর্ষণের জেরে পুণে জেলায় এক বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। জেলার পাতন গ্রামে পাহাড়ের ধস নেমে একটি আস্ত বাড়ি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। লোনাভলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই একজনের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও দুই বাসিন্দা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নিখোঁজদের খোঁজে উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়েছে।

ডিএসপি গজানন তোম্পে জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টির কারণে ওই পার্বত্য গ্রামে তিনটি বড় ধস ঘটেছে। তার মধ্যে একটি ধসে ঘরবাড়ি চাপা পড়ার এই ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, পুণের ঘোরাওয়াড়ি রেল স্টেশনের কাছে ভয়াবহ জলজমার জেরে একটি বেসরকারি বাস জলমগ্ন হয়ে মাঝরাস্তায় আটকে পড়েছিল। বিপদ বুঝে এনডিআরএফ-এর একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাসের ভেতর বিপন্ন অবস্থায় আটকে থাকা ৩৭ জন যাত্রীকে সুরক্ষিতভাবে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।

ভারী বৃষ্টির সতর্কতা ও প্রশাসনের তৎপরতা

আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও দু-তিন দিন মহারাষ্ট্রের উপকূলীয় জেলাগুলিতে এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি চলতে পারে। মুম্বই এবং পুণের পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির লাল ও কমলা সতর্কতা বহাল থাকছে। বৃষ্টির সাথে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে বলেও মৎস্যজীবী ও বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর ও বিপর্যয় উদ্ধারকারী দলগুলিকে সর্বদা সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রশাসনিক প্রধানরা।

মহারাষ্ট্রের এই ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আবারও মানুষের তৈরি আধুনিক পরিকাঠামোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। আগামী দিনে পরিস্থিতি কিছুটা থিতু না হওয়া পর্যন্ত রাজ্যবাসীকে কঠোর সতর্কতামূলক বার্তা মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেল ও সড়কপথের সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পরই আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে মুম্বই এবং পুণে। আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য জেলা প্রশাসনগুলির ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে।

(Feed Source: oneindia.com)