সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনা, সামনে ইংল্যান্ড

সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনা, সামনে ইংল্যান্ড

 

Football

-Ritesh Ghosh

নাটকীয়তার সব রসদ মজুত ছিল কানসাস সিটি স্টেডিয়ামের কোয়ার্টার ফাইনালে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ৩-১ গোলে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিজেদের জায়গা পাকা করে নিল। ফাইনালে ওঠার এই মহা লড়াইয়ে লিওনেল মেসিদের জন্য অপেক্ষা করছে তাঁদের দীর্ঘদিনের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড দল।

নির্ধারিত ৯০ মিনিটে খেলা ১-১ গোলে ড্র থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে জুলিয়ান আলভারেজের এক অসাধারণ দূরপাল্লার গোল আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে এগিয়ে দেয়। এরপর অতিরিক্ত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে লাউতারো মার্টিনেজ আর একটি গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন। তবে সুইজারল্যান্ডের ১০ জনে নেমে যাওয়া এবং নতুন ভিএআর (VAR) প্রযুক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক ম্যাচটিকে দীর্ঘকাল মনে রাখার মতো উপাদান জোগাল।

Lionel Messi celebrating Argentina s 2026 World Cup semi-final victory

এদিনের ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় অধিনায়ক লিওনেল মেসির এক নিখুঁত ক্রস থেকে চমৎকার হেডার দিয়ে বল প্রতিপক্ষের জালে জড়ান লিভারপুলের মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। কানসাস সিটির গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার নীল-সাদা সমর্থক তখন উল্লাসে মেতে ওঠেন। প্রথমার্ধের বাকি সময়ে আর্জেন্টিনা ব্যবধান বাড়ানোর বেশ কয়েকটি সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি।

বিরতির পর অবশ্য দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় সুইজারল্যান্ড। ইউরোপীয় দলটি প্রথমার্ধের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত ফুটবল খেলতে থাকে এবং আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে ক্রমাগত চাপ বাড়াতে থাকে। অবশেষে ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে ড্যান এনডোয়ে গোল করে সুইজারল্যান্ডকে সমতায় ফেরান। খুব কাছ থেকে নেওয়া তাঁর শটটি প্রতিহত করার কোনও সুযোগই পাননি আর্জেন্টিনার বিশ্বস্ত গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ১-১ সমতায় ফেরার পর ম্যাচটিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়।

এর ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত ঘটনাটি। ৭২তম মিনিটে ডাইভিং বা সিমুলেশনের দায়ে সুইজারল্যান্ডের অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরো। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রেফারিকে বেশ নাটকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এই বিশ্বকাপে চালু হওয়া নতুন নিয়মে রেফারির ভুল সিদ্ধান্ত এড়াতে চমৎকার ভূমিকা লক্ষ্য করা গেল।

আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার লেয়ান্দ্রো প্যারেডেসের একটি ফাউলকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। রেফারি প্রথমে মনে করেছিলেন প্যারেডেস ভুল ফাউল করেছেন, কিন্তু ভিএআর কক্ষে থাকা সহকারী ভিডিও রেফারি মূল রেফারিকে সিদ্ধান্তটি পুনরায় মাঠের স্ক্রিনে গিয়ে যাচাই করতে বলেন। রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা যায়, সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলো ইচ্ছাকৃতভাবে ডাইভ দিয়ে ফ্রি-কিক আদায়ের চেষ্টা করছিলেন। এরপরই রেফারি জোয়াও পিনহেইরো নিজের সিদ্ধান্ত বদলে এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন।

১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও কিন্তু সুইজারল্যান্ড লড়াই থামায়নি। নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ বক্সের ভিতরে একটি দুর্দান্ত অ্যাক্রোবেটিক সিজার-কিক নিলেও তা গোলরক্ষককে পরাস্ত করতে পারেনি। অন্যদিকে লিওনেল মেসি একা গোলরক্ষককে পেয়েও আলতো চিপে গোল করতে ব্যর্থ হন। রেফারি অফসাইডের পতাকা তুললেও টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় গোলটি হয়তো বৈধ হতে পারত।

নির্ধারিত ৯০ মিনিটে নতুন কোনও গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ে এসে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হলেও আর্জেন্টিনা আক্রমণে নতুন গতি নিয়ে আসে। অবশেষে ম্যাচের ১১২তম মিনিটে আসে সেই জাদুকরী মুহূর্ত। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে জুলিয়ান আলভারেজ এক অবিশ্বাস্য ও শক্তিশালী শটে বল সুইজারল্যান্ডের জালে জড়ান। বলটি পোস্টের ডান কোণ দিয়ে যখন জালে জড়ায়, তখন সুইস গোলরক্ষকের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না।

পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফিরতে মরিয়া সুইজারল্যান্ড তাদের সমস্ত খেলোয়াড়কে নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য ওপরে উঠে আসে। এর ফলে তাদের ডিফেন্স লাইন সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে এই সুযোগটিকেই চমৎকারভাবে কাজে লাগায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। থিয়াগো আলমাদার একটি অসাধারণ প্রতি-আক্রমণ থেকে বল পেয়ে লাউতারো মার্টিনেজ দলের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করেন এবং আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেন।

আগামী বুধবার মাঝরাতে আটলান্টায় বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনাল ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডও কিন্তু শনিবার নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছে, যেখানে রিয়াল মাদ্রিদের জুড বেলিংহাম একাই জোড়া গোল করেছেন। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবল দ্বৈরথের ইতিহাস অত্যন্ত সুদীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে শুরু করে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক লড়াই আজও ফুটবল ভক্তদের মনে রয়ে গেছে।

অন্য সেমিফাইনালে আগামী মঙ্গলবার মুখোমুখি হতে চলেছে স্পেন ও ফ্রান্স। প্রসঙ্গত, কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে এই ফ্রান্সকে হারিয়েই শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে পরপর দুবার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড রয়েছে কেবল মাত্র ইতালি ও ব্রাজিলের। স্কালোনির শিষ্যরা যেভাবে প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের নিংড়ে দিচ্ছেন, তাতে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে তৃতীয় কোনও দেশ হিসেবে এই বিশ্বরেকর্ড গড়ার স্বপ্ন দেখতেই পারে আর্জেন্টিনা।

বিশ্বকাপের টানা ম্যাচ এবং অতিরিক্ত সময়ের ধকল আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দে এবং এবার সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাদের অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত খেলতে হয়েছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে দলের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি কাটিয়ে উঠতে হবে। তবে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি যেভাবে কোটি কোটি ভক্তের স্বপ্ন নিয়ে নিজের শেষ বিশ্বকাপে লড়াই করছেন, তাতে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে সর্বস্ব উজাড় করে দিতে প্রস্তুত।

(Feed Source: oneindia.com)