মহাকাশের পথে অনিল মেনন! ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাসার বিজ্ঞানীর এই সফর কেন এত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ?

মহাকাশের পথে অনিল মেনন! ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাসার বিজ্ঞানীর এই সফর কেন এত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ?

 

International

-Ritesh Ghosh

মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে আরও এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করতে চলেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাসার মহাকাশচারী অনিল মেনন। মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই কাজাখস্তানের ঐতিহাসিক বৈকোনুর কসমোড্রোম থেকে রাশিয়ার সয়ুজ এমএস-২৯ মহাকাশযানে চেপে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের উদ্দেশে পাড়ি দেবেন তিনি। অনিলের এই প্রথম মহাকাশযাত্রার দিকে এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে সমগ্র ভারত। বিশেষ করে কেরল জুড়ে চলছে প্রবল উদ্দীপনা, কারণ এই রাজ্যের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে তাঁর পারিবারিক শিকড়।

নাসার এই বিজ্ঞানী তাঁর জীবনের প্রথম মহাকাশ মিশনে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার ভারতীয় সময় রাত ৮টা ১৭ মিনিটে মহাশূন্যের উদ্দেশে রওনা দেবে তাঁর মহাকাশযানটি। উৎক্ষেপণের পর মাত্র তিন ঘণ্টার রোমাঞ্চকর যাত্রা শেষে রাত ১১টা ২৬ মিনিটে সয়ুজ মহাকাশযানটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের প্রিচাল নামক বিশেষ মডিউলের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডকিং করবে।

NASA astronaut Anil Menon preparing for space mission

অনিল মেননের সাথে এই দীর্ঘ অভিযানে সহযাত্রী হিসেবে মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছেন রাশিয়ার অত্যন্ত অভিজ্ঞ কসমোনট পিওতর দুব্রভ এবং নারী মহাকাশচারী আন্না কিকিনা। এই দুই রুশ গবেষকের এটি দ্বিতীয় মহাকাশ যাত্রা হলেও ডঃ মেননের জন্য এটিই প্রথম ঐতিহাসিক এবং রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। তাঁরা তিনজন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রায় আট মাস দীর্ঘ সময় কাটিয়ে ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসে আবারও পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।

কেরল থেকে মহাকাশ: অনিল মেননের পারিবারিক শিকড়

আমেরিকার মিনেসোটা প্রদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অনিল মেননের শিকড় আদতেই দক্ষিণ ভারতের কেরলে। তাঁর পিতা সলিল মেনন ছিলেন কেরলের বাসিন্দা, অন্যদিকে তাঁর মা ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত। ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসের সঙ্গে কেরলের যোগাযোগ নতুন নয়। ঘটনাচক্রে, ভারতের প্রথম নিজস্ব মানববাহী মহাকাশ অভিযান ‘গগনযান’-এর জন্য নির্বাচিত অন্যতম প্রধান নভশ্চর, এয়ার কমোডোর প্রশান্ত বালকৃষ্ণন নায়ারও কেরলের পালাক্কড় জেলার ভূমিপুত্র।

নিজের দেশের মাটি থেকে অনিল মেননের এই অভিযানকে মন থেকে স্বাগত জানিয়েছেন এয়ার কমোডোর প্রশান্ত বালকৃষ্ণন নায়ার। গত বছর আমেরিকায় গগনযানের বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় অনিলের সঙ্গে তাঁর তৈরি হওয়া বন্ধুত্বের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে তিনি জানান, তাঁদের প্রায়ই কফি টেবিলে দেখা হতো। তখন মহাকাশ ভ্রমণের বিভিন্ন জটিল প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলত যা অত্যন্ত ফলপ্রসূ ছিল।

এয়ার কমোডোর প্রশান্ত বালকৃষ্ণন নায়ারের মতে, অনিল মেননের মহাকাশ যাত্রা মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কে সকলের মনে সচেতনতা ও গভীর কৌতূহল গড়তে অনন্য ভূমিকা নেবে। আন্তর্জাতিক স্তরে এই ধরনের বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সাফল্য তরুণ সমাজকে মহাকাশ গবেষণায় আরও বেশি অনুপ্রাণিত করবে। এই অভিযান বিশ্ব মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে তিনি মনে করেন।

জরুরি বিভাগের চিকিৎসক থেকে মহাকাশ গবেষণার শিখরে

পেশাগত জীবনে ডঃ অনিল মেনন একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান ও সুপরিচিত এমার্জেন্সি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা জরুরি বিষয়ের প্রধান চিকিৎসক। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর রয়েছে এক দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা। ২০২১ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা যখন তাদের বিশেষ মহাকাশচারী প্রার্থী ক্লাসের জন্য তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মনোনীত করে, তখনও তিনি চিকিৎসা সেবায় পুরোপুরি যুক্ত ছিলেন। পূর্বে তিনি নাসার একাধিক মহাকাশ মিশনে ফ্লাইট সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে ডঃ অনিলের অবদান সত্যিই অপরিসীম। তিনি বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ ইলন মাস্কের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স-এর প্রথম ফ্লাইট সার্জন হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর বিরল সৌভাগ্য লাভ করেছেন। বিশেষ করে ঐতিহাসিক ডেমো-২ মিশনের মাধ্যমে যখন স্পেসএক্স প্রথমবার মানুষকে মহাকাশে পাঠায়, তখন নভশ্চরদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী মেডিক্যাল টিম গড়ে তুলেছিলেন তিনি। মার্কিন বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানেও তাঁর কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কী ধরনের পরীক্ষা করবেন অনিল?

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘ আট মাস অবস্থানকালে অনিল মেনন এক্সপেডিশন ৭৪ এবং ৭৫-এর সদস্য হিসেবে একাধিক জটিল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা পরিচালনা করবেন। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হল জিরো গ্র্যাভিটি বা অতি-স্বল্প অভিকর্ষে সেমিকন্ডাক্টর ক্রিস্টাল উৎপাদন পদ্ধতির প্রক্রিয়াকরণ। এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হলে ভবিষ্যতে অত্যন্ত জটিল ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার এবং অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত ডিভাইস তৈরি করা আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।

একজন দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে ডঃ অনিল মহাকাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অগমেন্টেড রিয়ালিটি চালিত আল্ট্রাসাউন্ড ডিভাইস পরীক্ষা করবেন। এই প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হল গভীর মহাকাশ অভিযানে পৃথিবী থেকে কোনও যোগাযোগ বা সাহায্য ছাড়াই নভশ্চরদের অভ্যন্তরীণ রোগ নির্ণয় করা। এছাড়াও মাইক্রোগ্রাভিটি পরিবেশে মানুষের থ্রিডি রক্তনালী জৈবিকভাবে প্রিন্ট করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং মাধ্যাকর্ষণহীনতায় মানুষের বয়স বৃদ্ধির জৈবিক পরিবর্তনের ওপর বিশেষ গবেষণা পরিচালনা করবেন তিনি।

২০২৭ সালের এপ্রিল মাসে এই বিজ্ঞান মহাযজ্ঞের সফল সমাপ্তি ঘটিয়ে পুনরায় নীল গ্রহে ফিরে আসবেন অনিল মেনন। তাঁর এই দীর্ঘ অভিযান মানবজাতিকে বহির্জগতের নানা রহস্য উন্মোচনে যেমন নতুন পথ দেখাবে, তেমনই নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হবে। ভারত ও বিশ্বের আপামর অন্তরীক্ষপ্রেমীরা এখন অত্যন্ত গর্বের সাথে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন মঙ্গলবারের সেই রোমাঞ্চকর উৎক্ষেপণের ঐতিহাসিক মুহূর্তটির জন্য।

(Feed Source: oneindia.com)