ফের মেসি ম্যাজিক! ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফের ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা

ফের মেসি ম্যাজিক! ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফের ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা

নিজে গোল করতে পারেননি। তাতে কী হয়েছে? আর্জেন্টিনার জোড়া গোলে অ্যাসিস্ট সেই ফুটবল মহানায়কেরই। লিওনেল মেসি যেন ফের একবার প্রমাণ করলেন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব। অসাধারণ খেলে দলকে টেনে তুললেন আরও একটি ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে।

এদিন ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ফুটবল বিশ্ব সাক্ষী থাকল এক অবিশ্বাস্য ও মহাকাব্যিক নাটকের। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকেও ফাইনালে যাওয়ার টিকিট হাতছাড়া করল ইংল্যান্ড। শেষ বাঁশি বাজার মাত্র কয়েক মিনিট আগে লিওনেল মেসির চমৎকার ফুটবল মস্তিষ্ক এবং আর্জেন্টিনার লড়াকু মানসিকতার ওপর ভর করে ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে গেল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আগামী রবিবার শিরোপা রক্ষার শেষ লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি হবে আগুনে ফর্মে থাকা স্পেনের।

Lionel Messi celebrates Argentina s 2026 World Cup semi-final victory

ম্যাচের প্রথমার্ধ জুড়েই ছিল চোখে পড়ার মতো তীব্র উত্তেজনা এবং গতির লড়াই। দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কড়া ট্যাকল এবং উপর্যুপরি ১৯টি ফাউল প্রমাণ করে দিচ্ছিল ম্যাচটি কতটা মর্যাদার ছিল। তবে দ্বিতীয় অর্ধের শুরুতেই বাজিমাত করে ইংল্যান্ড। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে মর্গ্যান রজার্সের বাড়ানো একটি চমৎকার ক্রসে নিখুঁত হেড করে বল জালে জড়ান থ্রি লায়ন্সের স্ট্রাইকার অ্যান্থনি গর্ডন। এই গোলের পর টমাস টুখেলের শিষ্যরা একপ্রকার জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছিলেন।

মেসি ম্যাজিক ও রুদ্ধশ্বাস প্রত্যাবর্তন

গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার পর অত্যন্ত চাপে পড়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ লিওনেল মেসিকে বোতলবন্দি করে রেখেছিল ম্যাচের অধিকাংশ সময় জুড়ে। এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে দলকে টেনে তুলতে মাস্টারস্ট্রোক দেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি মাঠে নামান রদ্রিগো ডি পল, লাউতারো মার্তিনেস এবং অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দির মতো ফুটবলারদের। এই পরিবর্তনের পর আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং তারা ইংল্যান্ডের ডিফেন্স কাঁপাতে শুরু করে।

আর্জেন্টিনা যখন একের পর এক আক্রমণ করেও গোল পাচ্ছিল না, এবং ইংল্যান্ড যখন জয় সুরক্ষিত করতে লো-ব্লক ডিফেন্সে জোর দিচ্ছিল, তখনই ঘটে ম্যাচের প্রথম টার্নিং পয়েন্ট। ৮৫ মিনিটে বক্সের বাইরে বল পেয়ে একটু জায়গা তৈরি করে নেন এনসো ফের্নান্দেস। অত্যন্ত দূরপাল্লার এক দর্শনীয় শটে ইংল্যান্ডের অতন্দ্র প্রহরী জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান তিনি। এই জাদুকরি সমতাসূচক গোলটি আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

নির্ধারিত নব্বই মিনিটের খেলা সমতায় শেষ হওয়ার পর রেফারি অতিরিক্ত সময় হিসেবে ৯ মিনিট ঘোষণা করেন। ঠিক এই সময়েই আবারও নিজের বিশ্বখ্যাত ক্লাস চেনালেন ফুটবলের মহাতারকা মেসি। ম্যাচের ৯২ মিনিটে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ওপর দিয়ে ডান প্রান্ত থেকে একটি মাপা এবং তীক্ষ্ণ ক্রস বাড়ান বক্সের ঠিক ভিতরে। সেখানে অরক্ষিত অবস্থায় ছুটে আসা লাউতারো মার্তিনেস এক দুর্দান্ত হেডে ইংল্যান্ডের জাল কাঁপিয়ে দেন। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পুরো ম্যাচের চালচিত্র।

ইংল্যান্ডের ট্র্যাজেডি ও স্পেনের সঙ্গে ফাইনালের মহারণ

ম্যাচের একেবারে শেষ সময়ে এভাবে গোল খেয়ে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করেও সমতা ফেরাতে ব্যর্থ হন হ্যারি কেনরা। ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালের মঞ্চে ওঠার যে দীর্ঘ প্রতীক্ষা থ্রি লায়ন্সদের ছিল, তা আরও একবার ট্র্যাজিক হারের মাধ্যমে দীর্ঘায়িত হল। হারের ধাক্কায় মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় একাধিক ইংরেজ তারকা ফুটবলারকে।

আর্জেন্টিনা টানা তৃতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার অনন্য রেকর্ড গড়ল। এই নাটকীয় জয়ে আবারও প্রমাণিত হল কেন লিওনেল মেসিকে সর্বকালের সেরা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ম্যাচের বড় অংশ জুড়ে তাঁকে নিস্তেজ রাখতে পারলেও, মাত্র কয়েকটি মুহূর্তেই তিনি ম্যাচের পরিস্থিতি নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নিলেন। দুটি গোলের পিছনেই তাঁর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দলের খেলোয়াড়দের নতুন করে উদ্দীপ্ত করে তোলে।

আর্জেন্টিনার ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার লড়াইটি আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে অন্য সেমিফাইনালের ফলাফল। সেখানে কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ইতিমধ্যেই শিরোপার লড়াই নিশ্চিত করে রেখেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের অপ্রতিরোধ্য স্পেন। স্বভাবতই ফুটবলপ্রেমীরা আগামী রবিবারের এই ব্লকবাস্টার ফাইনালের কাউন্টডাউন শুরু করে দিলেন। টুর্নামেন্টের গতিময় ফুটবল খেলা স্প্যানিশ তারুণ্যের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার নিখুঁত ডিফেন্স ও বিশ্বমানের আক্রমণভাগের এই জমজমাট লড়াই অত্যন্ত রোমাঞ্চকর হতে চলেছে।

ইংল্যান্ড দলের কোচ টমাস টুখেল ম্যাচ শেষে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। ম্যাচের একটা বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পরেও শেষ মুহূর্তের অমনোযোগিতার জন্য দলকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, মেসির মতো সেরা ফুটবলারের বিরুদ্ধে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ঢিলেমি কতটা মারাত্মক হতে পারে, এই ম্যাচ তারই আরও একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ। তবে দলের এই লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করতে ভোলেননি তিনি।

আর্জেন্টিনা তাদের বিশ্বজয়ের মুকুট ধরে রাখা থেকে আর মাত্র এক ম্যাচ দূরে রয়েছে। কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকেই আলবিসেলেস্তেরা বিশ্বমঞ্চে এক অতি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। মাঠে একে অপরের জন্য প্রাণপণ লড়াই করার যে তাড়না তারা দেখায়, তা সত্যিই অভাবনীয়। কোচ স্কালোনির নিখুঁত রণকৌশল এবং মাঠের ভিতরে তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঠিক সংমিশ্রণই তাদের আরও একবার ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ লড়াইয়ে নিয়ে এসেছে।

রবিবারের ফাইনাল ঘিরে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। ফুটবল বিশ্বের কোটি কোটি ভক্ত এখন সময়ের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। বয়সকে জয় করে লিওনেল মেসি কি পারবেন তাঁর কেরিয়ারে আর একটি সোনালী ট্রফি যোগ করতে, নাকি নবীন স্প্যানিশ ফুটবলারদের হাত ধরে বিশ্ব ফুটবলনতুন যুগ শুরু হবে? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কয়েক দিনের ব্যবধানে মেগা ফাইনালে। বিশ্ব ফুটবল আরও একটি শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালের প্রতীক্ষায় দিন গুনতে শুরু করে দিয়েছে।

(Feed Source: oneindia.com)