সফলভাবে মহাকাশে পাড়ি দিল ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেট ‘বিক্রম-১’, মহাকাশ গবেষণায় আরও এক সাফল্য ভারতের

সফলভাবে মহাকাশে পাড়ি দিল ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেট ‘বিক্রম-১’, মহাকাশ গবেষণায় আরও এক সাফল্য ভারতের

 

India

-Ritesh Ghosh

ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক অসামান্য অধ্যায়ের সূচনা হল। অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার (SDSC-SHAR) থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হল দেশের প্রথম বেসরকারি অরবিটাল-ক্যাপাসিটি সম্পন্ন রকেট ‘বিক্রম-১’। বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা স্টার্টআপ ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর তৈরি এই রকেটটি শুধু সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছয়নি, তার সঙ্গে থাকা জরুরি কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকেও নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। ‘মিশন আগমন’ নামের এই অভিযান ভারতের বেসরকারি মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করল।

উৎক্ষেপণের ঠিক আগে একটি অভ্যন্তরীণ কারিগরি বাধার কারণে কিছুক্ষণের জন্য কাউন্টডাউন থামাতে হয়েছিল। তবে সেই সাময়িক উদ্বেগ কাটিয়ে মহাকাশের উদ্দেশে পাড়ি দেওয়ার পর রকেটের প্রথম থেকে চতুর্থ—সবকটি স্তরের পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সুসম্পন্ন হয়েছে। প্রথম প্রচেষ্টাতেই সব কটি ধাপের এই সাফল্য প্রমাণ করে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের অসীম ক্ষমতা। এই সফল উৎক্ষেপণ ভারতকে বিশ্বের সেই মুষ্টিমেয় দেশের তালিকায় জায়গা করে দিল, যারা স্বাধীনভাবে কক্ষপথে রকেট পাঠাতে সক্ষম।

Vikram-1 rocket lifting off during its successful space mission

প্রযুক্তি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অনন্য মেলবন্ধন বিক্রম-১

প্রায় সাত তলা বাড়ির সমান দীর্ঘ বা ২২ মিটার লম্বা এই ‘বিক্রম-১’ অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ কার্বন কম্পোজিট দিয়ে তৈরি একটি বহুতল বিশিষ্ট শক্তিশালী উৎক্ষেপণ যান। রকেটের ওজন কমানো এবং শক্তির ভারসাম্য রাখার জন্য এই কার্বন কম্পোজিটের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই শক্তিশালী রকেটটি সর্বোচ্চ ৩৫০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত ওজনের পেলোড বা কৃত্রিম উপগ্রহকে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে সুরক্ষিতভাবে পৌঁছে দিতে সক্ষম।

বিক্রম-১ রকেটের চালিকাশক্তিটি তৈরি করা হয়েছে সম্পূর্ণরূপে নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তিতে। এর নির্মাণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক থ্রি-ডি প্রিন্টেড রকেট ইঞ্জিন এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সলিড রকেট মোটর। এই প্রথম কোনও ভারতীয় বেসরকারি উদ্যোগে এই স্তরের জটিল ও ভারী প্রযুক্তিগত নির্মাণ সফল হল। এটি একদিকে যেমন উৎপাদন সময় অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে, অন্যদিকে রকেট লঞ্চের বিশ্বব্যাপী ব্যবস্থার সংস্কার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।

রকেটটির প্রথম পরীক্ষামূলক উড়ানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি প্রদর্শনী পেলোড মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাহা স্পেস, কসমোসার্ভ, ডি-কিউবড এবং স্কাইরুটের নিজস্ব ‘স্কোপ’ পরীক্ষার বিভিন্ন আধুনিক বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম। উপগ্রহগুলি সফলভাবে কক্ষপথে স্থাপিত থাকায় ভারতের নিজস্ব উপগ্রহ নির্মাণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এটি একটি দারুণ ইতিবাচক দিক উন্মোচন করল। ছোট উপগ্রহের উৎক্ষেপণ বাজারে ভারতের অবস্থান এই মিশনের দ্বারা আরও সুসংহত হলো।

মহাকাশে বন্দে মাতরমের স্মারক বার্তা

এই বৈজ্ঞানিক পেলোডের পাশাপাশি এই রকেটে পাঠানো হয়েছে অত্যন্ত আবেগঘন এবং আকর্ষণীয় কিছু স্মারক। যার মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিজের হাতে লেখা ‘বন্দে মাতরম’ বিশিষ্ট একটি বিশেষ পোস্টকার্ড। এছাড়াও বর্তমান ও পূর্বতন ইসরো প্রধানদের পাশাপাশি ভারতের মহাকাশচারী, স্কাইরুটের সাধারণ কর্মী, বিনিয়োগকারী এবং বিশ্বজুড়ে থাকা তাঁদের অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীদের হাতে লেখা শুভেচ্ছা বার্তাও এই রকেটের মাধ্যমে আজ মহাকাশের কক্ষপথে এক সুন্দর সহাবস্থানে পৌঁছে গিয়েছে।

২০১৮ সালে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা তথা ইসরোর (ISRO) দুই প্রাক্তন বিজ্ঞানী পবন কুমার চন্দনা এবং নাগা ভারত ডাকা এক বুক স্বপ্ন নিয়ে স্কাইরুট অ্যারোস্পেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত বড় ও ব্যয়বহুল সরকারি রকেটের পাশাপাশি বাণিজ্যিক স্তরের জন্য সস্তা, নির্ভরযোগ্য এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরি করা। ২০২২ সালে এই সংস্থার তৈরি ‘বিক্রম-এস’ দেশের প্রথম বেসরকারি রকেট হিসেবে ইতিহাস গড়েছিল, তবে অরবিটাল কক্ষপথে যান পাঠানোর মিশন এদিন পূর্ণতা পেল।

বেসরকারি মহাকাশ নীতির যুগান্তকারী জয়

এই অভিযানের বিপুল সাফল্য কেবল একটি কোম্পানির সীমানায় আটকে নেই, এটি ভারতীয় মহাকাশ ক্ষেত্রের ঐতিহাসিক সংস্কারের চূড়ান্ত প্রমাণ। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক মহাকাশ ক্ষেত্রের উদারীকরণ নীতি বেসরকারি ব্যবসা ও প্রযুক্তিসংস্থাগুলির জন্য মহাকাশের অসীম সীমান্ত খুলে দিয়েছে। ইসরোর সুযোগ-সুবিধা এবং পরিকাঠামো ব্যবহার করে একটি বেসরকারি দলের এই সাফল্য আগামী দিনে দেশে নতুন স্টার্টআপ সংস্কৃতির প্রসার ঘটাবে। বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগও এখন ভারতের এই অগ্রগামী মহাকাশ ক্ষেত্রে আসতে বাধ্য।

বিশ্বজুড়ে এখন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট, আধুনিক কৃষিকাজ এবং জলবায়ু পরীক্ষার জন্য ছোট ছোট বাণিজ্যিক উপগ্রহের ব্যবহারের জোয়ার এসেছে। কম খরচে ছোট উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানোর বিশ্বব্যাপী চাহিদাকে কাজে লাগাতে ‘বিক্রম-১’ অত্যন্ত কার্যকরী হয়ে উঠবে। আজকের এই উড্ডয়ন থেকে সংগৃহীত বিপুল কারিগরি এবং গাণিতিক তথ্য আগামী দিনের অভিযানগুলিকে আরও নিখুঁত করতে স্কাইরুটকে প্রয়োজনীয় শক্তি ও আত্মবিশ্বাস জোগাবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটির গবেষণা দল।

স্কাইরুট অ্যারোস্পেস খুব দ্রুত নিয়ম মেনে অত্যন্ত সহজ উপায়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরবর্তী মহাকাশ উড়ান চালুর দিকে মন দিয়েছে। এই উৎক্ষেপণের মাধ্যমে অর্জিত উন্নতমানের ডেটা ‘বিক্রম’ সিরিজের পরবর্তী রকেটগুলির ডিজাইনে আমূল পরিবর্তন আনবে। সংস্থাটির মূল উদ্দেশ্য আগামী দিনে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের দৈনিক সময়সীমা অনেকটাই কমিয়ে আনা, যা বিশ্বমঞ্চে ইসরো এবং স্পেসএক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপে ভারতের ভূমিকাকে আরও উল্লেখযোগ্য করতে বড় ভূমিকা পালন করবে।

ভারতের মহাকাশ গবেষণার জনক ডক্টর বিক্রম সারাভাইয়ের স্বপ্নকে সামনে রেখে এই যাত্রার যে সূচনা হয়েছিল, তা আজ শ্রীহরিকোটার আকাশ ছুঁয়ে ইতিহাস গড়ল। মিশন আগমন শুধুমাত্র একটি উপগ্রহ প্রেরণের সফল ঘটনা নয়, এটি এক নতুন আত্মনির্ভর ভারতের অগ্রযাত্রার অত্যন্ত উজ্জ্বল প্রমাণ। আগামী দিনে এই ধরনের উৎক্ষেপণগুলি বিশ্বমঞ্চে ভারতের বাণিজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এক নতুন অনন্য শক্তির পরিচয় দেবে বলেই মনে করছেন বিজ্ঞান গবেষক মহল।

(Feed Source: oneindia.com)