)
LPG Price hike big update: গ্যাসের দাম কমার ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধকালীন সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলের উত্তেজনা অদূর ভবিষ্যতে মেটার কোনো লক্ষণ নেই।
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভারতের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের রান্নার গ্যাসের খরচের হিসেবে বড় উদ্বেগের ছবি সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে (FY27) দেশের এলপিজি (LPG) বা রান্নার গ্যাসের ভরতুকি বাবদ মোট খরচ ১ লক্ষ কোটি টাকার গণ্ডি পার করে যেতে পারে। এই বিপুল খরচের জেরে সরকারের কেন্দ্রীয় বাজেটে এলপিজি-র জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকার একটি বিশাল আর্থিক ঘাটতি বা ব্যবধান তৈরি হতে চলেছে, যা দেশের রাজকোষের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনৈতিক পূর্বাভাস এবং বাস্তবের অঙ্কের মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হওয়ায় ভারতের রান্নার গ্যাসের (LPG) বাজার নিয়ে তাই চরম উদ্বেগ। কেন্দ্রীয় সরকার বাজেটে রান্নার গ্যাসের ভরতুকি বাবদ যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছিল, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে খরচ তার চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই বিপুল আর্থিক বোঝা সামাল দিতে কেন্দ্র সরকার কি এবার গ্রাহক স্তরে রান্নার গ্যাসের দাম একধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়ে দেবে? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের আর্থিক ও রাজনৈতিক মহলে।
সর্বভারতীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকার সাধারণত বাজেটে রান্নার গ্যাসের ভরতুকির জন্য যে পরিমাণ অর্থ অনুমোদন করে, বর্তমান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারের বাস্তব চিত্র তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। ক্রমবর্ধমান অশোধিত তেল ও এলপিজি-র আন্তর্জাতিক মূল্য এবং দেশে রান্নার গ্যাসের লাগাতার চাহিদার কারণে সরকারের ভরতুকি বিল রকেটের গতিতে বাড়ছে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ অর্থবর্ষে এই মোট ভরতুকি যখন ১ লক্ষ কোটি টাকা স্পর্শ করবে, তখন বাজেটে অনুমোদিত অর্থের পরিমাণ তার তুলনায় অনেক কম থাকবে। ফলে এই ৭০,০০০ কোটি টাকার ঘাটতি কী ভাবে মেটানো হবে, তা নিয়ে অর্থ মন্ত্রকের অন্দরে চিন্তা বাড়ছে।
খরচ বৃদ্ধির মূল কারণ কী কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্বাভাবিক ভরতুকি বিল বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে।
১. প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (LPG) মূল্যের অস্থিরতা। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ লাইনে সমস্যার কারণে বিশ্ববাজারে গ্যাসের আমদানি খরচ অনেক বেড়েছে।
২. দ্বিতীয়ত, সরকারের ‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’ (PMUY)-র সম্প্রসারণ। দেশের কোটি কোটি দরিদ্র পরিবারকে নিখরচায় গ্যাস সংযোগ দেওয়ার পর, তাদের সিলিন্ডার রিফিলের ওপর দেওয়া ভরতুকির মোট পরিমাণ এখন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩. তৃতীয়ত, দেশীয় বাজারে খুচরো মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকার আন্তর্জাতিক দাম বাড়লেও গ্রাহকদের ওপর পুরো বোঝা চাপাচ্ছে না, বরং ভরতুকির মাধ্যমে নিজেরাই তা বহন করছে।
পশ্চিম এশিয়ার সংকট ও তেলের বাজারে আগুন:
গ্যাসের দাম কমার ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধকালীন সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলের উত্তেজনা অদূর ভবিষ্যতে মেটার কোনো লক্ষণ নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব তেল ও গ্যাস সরবরাহ লাইনে। আমদানি খরচ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলোর (OMCs) ওপর লোকসানের বোঝা বাড়ছে, যা পরোক্ষভাবে চাপ তৈরি করছে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর।
অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব:
এই ৭০,০০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত আর্থিক ঘাটতি দেশের সামগ্রিক রাজকোষ ঘাটতি (Fiscal Deficit)-র লক্ষ্যমাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। সরকার যদি এই বিশাল পরিমাণ অর্থ এলপিজি ভরতুকিতেই খরচ করে ফেলে, তবে অন্যান্য পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমানোর বা পুনর্বিন্যাস করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।
ওএমসি (OMC) বা রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলোর ওপরও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে, যদি সরকার তাদের প্রাপ্য ভরতুকির টাকা সময়মতো মিটিয়ে দিতে না পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
১. আর্থিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে সরকারকে ভরতুকি ব্যবস্থার আরও যৌক্তিকীকরণ (Rationalization) করতে হবে। যারা সচ্ছল বা উচ্চ আয়ের অধিকারী, তাদের ভরতুকির আওতা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র প্রকৃত দরিদ্র ও ‘উজ্জ্বলা’ গ্রাহকদের জন্যই এই সুবিধা সীমিত রাখা উচিত।
এর পাশাপাশি,
২. পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস (PNG) সরবরাহ বাড়ানো এবং রান্নার কাজে বিদ্যুৎ বা সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত করা দীর্ঘমেয়াদে এই এলপিজি ভরতুকির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে।
দাম বাড়ার আশঙ্কা কতটা জোরালো?
সাধারণত ভোট বা রাজনৈতিক সমীকরণের কথা মাথায় রেখে সরকার খুচরো বাজারে রান্নার গ্যাসের দাম সরাসরি বাড়াতে চায় না, বরং ভরতুকি দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু ৭০,০০০ কোটি টাকার এই রেকর্ড ঘাটতি সরকারের সেই সুরক্ষাকবচকে দুর্বল করে দিয়েছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, রাজকোষ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা বজায় রাখতে এবং তেল সংস্থাগুলোকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে কেন্দ্র হয়তো খুব শিগগিরই রান্নার গ্যাসের দাম একলাফে অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ও গার্হস্থ্য সিলিন্ডার— উভয় ক্ষেত্রেই এই দাম বৃদ্ধির কোপ পড়তে পারে।
রান্নার গ্যাসের ভরতুকি বিল ১ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া সরকারের কল্যাণমুখী নীতি ও রাজকোষের বণ্টনের মধ্যে বিরাট ফারাক দেখা যাচ্ছে। একদিকে দরিদ্র সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া যেমন জরুরি, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে সরকার কী ভাবে এই ৭০,০০০ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ঘাটতি সামাল দেবে? তাহলে কি আরও বাড়বে রান্নার গ্যাসের দাম? মধ্যবিত্তর নাভিশ্বাস উঠিয়ে আরও মহার্ঘ্য হবে ডোমেস্টিক সিলিন্ডার?
(Feed Source: zeenews.com)
