India
-Ritesh Ghosh
পার্লামেন্টের বাদল অধিবেশন শুরু হওয়া মাত্রই দেশের গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে তৈরি হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক চাঞ্চল্য। অধিবেশন শুরুর মুখে সংসদ ভবনের বাইরে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সমস্ত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একটি গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, বিরোধীদের হট্টগোল ও অধিবেশন বয়কট নয়, বরং সঠিক তথ্য ও যুক্তিভিত্তিক বিতর্কই সংসদের গরিমা রক্ষা করতে পারে এবং দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
চলতি বর্ষার নিরিখে সংসদের কার্যপ্রণালীর চমৎকার তুলনা টেনেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, বর্ষাকাল যেমন প্রকৃতির বুকে নতুন সজীবতা এনে দেয়, বাদল অধিবেশন যদি সমস্ত রাজনৈতিক জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠে কর্মমুখর ও অর্থবহ থাকে, তবে তা দেশের সার্বিক উন্নতি ঘটাতে বড় সাহায্য করবে। ভারতবাসীর সামগ্রিক কল্যাণ ও প্রগতির স্বার্থেই সংসদের উভয় কক্ষে যেন প্রতিটি জরুরি বিষয় নিয়ে সুস্থ আলোচনার এক সুন্দর বাতাবরণ তৈরি করা যায়, সেই আশাই ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।

সংসদের কাজের পরিমণ্ডলের বাইরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পুরো বক্তৃতায় এক নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে ভারতের মহাকাশ প্রযুক্তির অসাধারণ সাফল্য। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দেশের বিজ্ঞানীদের প্রশংসা করেছেন, ঠিক তেমনই সেই মঞ্চকে ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক আক্রমণ ছুড়ে দিয়েছেন। বেসরকারি মহাকাশ স্টার্ট-আপ ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর তরুণ বিজ্ঞানীদের কাজের প্রশংসা এবং রাহুল গান্ধীকে লক্ষ্য করে তাঁর মন্তব্যে জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের মোড়ক উন্মোচিত হল।
মহাকাশ গবেষণা ও ৫৬ বছরের ‘যুবক’ প্রসঙ্গ
প্রধানমন্ত্রী মোদী স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের বিজ্ঞানীদের সাফল্যের উদাহরণ টেনে দেখান কীভাবে ভারতের যুবসমাজ আজ দেশের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, হায়দরাবাদের এই মহাকাশ স্টার্ট-আপ সংস্থায় কর্মরত বিজ্ঞানীদের গড় বয়স মাত্র ২৮ বছর। এই সাফল্যের প্রশংসা করতে গিয়েই মোদী হঠাৎ বলেন, “আমি কিন্তু আজ কোনও ৫৬ বছরের যুবকের কথা বলছি না।” নাম না নিলেও, এই তীক্ষ্ণ কটাক্ষের নিশানায় ছিলেন রাহুল গান্ধীই।
বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের তরুণদের এই বিশাল কর্মকাণ্ড কীভাবে আজ ভারতকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে গভীর গর্ব প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান গতিশীল বিশ্বমঞ্চে ভারতের তরুণ প্রজন্মের এই বিশেষ কৃতিত্ব বিশ্বব্যাপী সব মহলের বড় স্বীকৃতি আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। এটিকে ভারতের অমিত সম্ভাবনা ও তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি জানান যে, দেশের আকাঙ্ক্ষা ও মেধা মহাকাশের মতোই অন্তহীন।
বাদল অধিবেশনে সরকারের আইনি অ্যাজেন্ডা ও নতুন বিল
দেশের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সংসদের এই বাদল অধিবেশন আগামী ১৩ অগাস্ট পর্যন্ত চলতে চলেছে। এই সময়ের মধ্যে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবাহী নতুন বিল উভয় কক্ষে পাস করিয়ে নেওয়ার জন্য চূড়ান্ত আইনি খসড়া প্রস্তুত করেছে। এই তালিকায় অন্যতম অগ্রাধিকার পাচ্ছে আয়কর কাঠামোর সংস্কার, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য নতুন অর্থনৈতিক নীতি এবং দেশের শীর্ষ আদালতের পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ।
তহবিল ও জাতীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় রকমের সংস্কারের অংশ হিসেবে মোদী সরকার এই অধিবেশনে ‘ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মাধ্যমে বিদেশি সাহায্য ও অনুদানের বিধিনিষেধকে কড়া নজরদারির আওতায় এনে স্বচ্ছতা সুনিশ্চিত করা হবে। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সার্বিক উন্নতি ও যুগোপযোগী জ্ঞান চর্চাকে প্রাধান্য দিতে ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিল, ২০২৫’ আনা হবে, যা পূর্বে সংসদে পেশ হওয়ার পর বিশ্লেষকদের চুলচেরা পর্যালোচনার জন্য যুক্ত সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছিল।
দেশের অর্থনৈতিক শক্তি বজায় রাখতে ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা দিতে ‘ইনকাম ট্যাক্স (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ পেশ করার কথা ভাবছে কেন্দ্র সরকার। এর মূল লক্ষ্য হল কর ছাড়ের নীতি সম্প্রসারিত করে দেশের ঋণ বাজারকে আরও চাঙ্গা করে গড়ে তোলা। পাশাপাশি, বিচার ব্যবস্থার বোঝাকে লঘু করতে ও জমে থাকা বিপুল মামলার সমাধান করতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সংখ্যা প্রধান বিচারপতি বাদে ৩৩ থেকে বাড়িয়ে ৩৭ করার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
দেশের ছোট ও মাঝারি কুটির শিল্প খাতের স্বার্থে এবং ব্যবসায়ী মহলে ব্যবসা করার সহজ পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার ‘এমএসএমই ডেভেলপমেন্ট (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ পেশ করবে। এর উদ্দেশ্য হলো বিলম্বিত অর্থপ্রদান বা পেমেন্ট সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের প্রাচীন সমস্যার আইনি নিষ্পত্তি করা ও রাজ্যগুলির বিরোধ নিষ্পত্তি পরিষদকে আরও শক্তিশালী করে তোলা। পাশাপাশি, জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত আইনকে আরও কঠোর করতে এবং জাতীয় পতাকার পরিপন্থী কার্যকলাপ রুখতেও নতুন কিছু বিধি আনার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিতর্কিত বিষয় ও নীতিগত সংস্কার নিয়ে আলোচনার কারণে এই বাদল অধিবেশন রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। সরকার যেমন সবরকম ভাবে তাদের প্রস্তাবিত বিল পাস করাতে ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে, তেমনই জনগণের প্রধান সমস্যাগুলো নিয়ে সংসদে সুর চড়ানোর জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী দলগুলিও। গণতান্ত্রিক রীতিনীতির অধীনে দেশের প্রকৃত উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন অবশেষে কোন পথে এগোয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
(Feed Source: oneindia.com)
